প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৪
সুনামগঞ্জ মা শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি সাধারণ্যে মাতৃমঙ্গল নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। সুনামগঞ্জের অতি প্রাচীন একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এটি। শহরের কেন্দ্রস্থলে পুরনো জজ কোর্টের সামনে মনোরম পরিবেশে একটি টিনশেড ভবনে এই সেবাকেন্দ্র চালু হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫১ সনে। প্রতিষ্ঠার পর প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে গৌরবের ৭৫ বছর অতিক্রম করেছে।
তাই সুনামগঞ্জবাসীর ভালোবাসা ও আবেগের স্পর্শ রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি। অনেক বয়স্ক ব্যক্তি স্মৃতি রোমন্থন করে এই কেন্দ্রে নিজের জন্মগ্রহণের তথ্য দিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে তাঁর সন্তানের জন্মও যে এই কেন্দ্রেই হয়েছে তাও সগৌরবে উল্লেখ করেন। নবজাতকের জন্ম, মা ও শিশুসেবার জন্য নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছিলো এটি। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারের অন্যতম ভরসার জায়গা ছিলো এটি। প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সরকার পুরনো টিনশেড ভবনটি ভেঙে নতুন আট তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন ২০২৩ সনে। আট তলা ভবনে ২০ শয্যার সুবিধাসহ মা ও শিশুসেবার উন্নততর ব্যবস্থা করার জন্যই পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের এই উদ্যোগ। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিতব্য এই ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সনে। এর ব্যয় ধরা ছিলো প্রায় ১৫ কোটি টাকা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় ভবনটির ৭ তলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাই ও দেয়ালে ইট গাঁথুনির কাজ শেষ হয়েছে। অষ্টম তলার ছাদ ঢালাইসহ অন্যান্য কাজ বাকি আছে। কিন্তু ২০২৪ সনের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে কাজটি বন্ধ আছে। বর্তমানে হাসননগরের ভাড়া করা একটি বাসায় অস্থায়ীভাবে সেবাকেন্দ্রের কাজ কোনোরকমে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। ভাড়া বাসায় জটিল ধরনের প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশন করার কোনো ব্যবস্থা নেই। নরমাল ডেলিভারি করানোসহ অন্যান্য সেবা দেয়ার সামর্থও কম। ফলে জেলার নিম্নবিত্ত লোকজন গভীর সংকটে পড়েছেন। সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য রোগীদের ছুটতে হয় প্রাইভেট ক্লিনিকে। কিন্তু সেখানে সেবা পেতে যে টাকা খরচ করতে হয় সেই সঙ্গতি থাকে না অধিকাংশ পরিবারের। জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ শেষ করে ওখানে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা চালু করার জন্য সুনামগঞ্জের খবরের মাধ্যমে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
উন্নয়ন কাজ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সরকার পরিবর্তনের সাথে এই কাজ বন্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে বিগত সরকার উন্নয়ন কাজে দলীয় ঠিকাদার নিয়োগের যে সংস্কৃতি তৈরি করেছিলো তাতে সরকার পরিবর্তনের পর বহু ঠিকাদার কাজ ফেলে রেখে পালিয়ে গেছেন। বর্ণিত ভবনের ঠিকাদারও এমন পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি কি—না তা আমরা জানি না। তবে আমরা কেবল এটুকু বলতে পারি, সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারার জন্য ঠিকাদারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিৎ। জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারি সহকারি প্রকৌশলী হুসনুল করিম সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, ২০২৪ সনে প্রকল্প মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন ডিপিপি অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে অসমাপ্ত কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তবে এই কাজ কতোদিনে শেষ হবে তা তিনি নিশ্চিত করে ধারণা দিতে পারেননি। তাঁর দেয়া তথ্য মতে, ২০২৪ সন পর্যন্ত কাজের ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছিলো। স্পষ্ট যে, পূর্ববর্তী ঠিকাদারের কাজের গতি অত্যন্ত শ্লথ ছিলো। কাজের গতি কম না থাকলে প্রকল্প মেয়াদের (২০২৪) মধ্যেই কাজটি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। আর দশটা সরকারি কাজের মতো এখানেও ঠিকাদারি অরাজকতা, আমলাতান্ত্রিক তদারকিহীনতা ও অবহেলার নজির সমানভাবে পরিদৃশ্যমান। একটি অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জনস্বার্থের জায়গায় এমন অবস্থা কাম্য নয়। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা একটি অঞ্চল বা দেশের উন্নয়নের আয়না বিশেষ। এই আয়নার দিকে তাকিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়— কেমন আছে ওই অঞ্চলটি।
সুনামগঞ্জের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভরসার জায়গা এই স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রটি যাতে অতীতের সময়ক্ষেপণের অন্ধকার বৃত্ত ভেঙে দ্রুত সক্ষমতার আলো দেখাতে সক্ষম হয় সেই প্রত্যাশা সকলের। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অদিদপ্তর ও এই সেবাকেন্দ্রের সেবাদানকারী স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রতি আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ, পদ্ধতিগত প্রক্রিয়াগুলোকে তরান্বিত করে অবশিষ্ট ৫০ ভাগ কাজ সম্পন্নপূর্বক মা ও শিশুদের ভরসা এবং আস্থার প্রতীকে পরিণত হোন। আমরা বিশ^াস করি, আন্তরিকতা থাকলে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া কখনও অন্তরায় হতে পারে না। আমরা ওই আন্তরিকতাটুকু দেখতে চাই। তখন অসংখ্য মানুষের ভিতর যে সন্তুষ্টি তৈরি হবে তা পুষ্পবৃষ্টির মতো বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও সেবাদানকারীদের শুভেচ্ছায় সিক্ত করবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন