আশার সৌরবিদ্যুতে অপচয় অবাঞ্ছিত

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৮

দেশ যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে হিমশিম খাওয়ার দশা, যখন প্রতিদিন একাধিকবার লোডশেডিংয়ের ঘটনা নৈমিত্তিক; তখন একটি উপজেলা পরিষদের ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুত প্যানেল আট বছর ধরে অকেজো পড়ে থাকার খবর নিতান্তই দুঃখজনক। জীবাশ্মভিত্তিক জ¦ালানি ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ব্যবহারের উপর অনেকদিন ধরেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আমদানিকৃত জ¦ালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্ভরতা কমানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় বড়, ছোট ও মাঝারী শক্তির সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়। কিন্তু এগুলোর বর্তমান হাল—হকিকত কী তা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও এসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অধিকাংশই যে এখন অকেজো পড়ে আছে তা অনুমান করা যায়। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ছাদে ৩০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসানো হয় ২০১৩ সনে। তখন এতে ব্যয় হয়েছিলো এক কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটি চালুর দুই থেকে তিন বছরের মাথায়ই বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়া শুরু করে। প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, অর্থবরাদ্দ কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের নামোল্লেখ না থাকার কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশ মেরামত করে এটি সচল করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। একসময় প্রকল্পের সকল যন্ত্রপাতিই বিনষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি অর্থ অপচয় ও দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জলজ¦্যন্ত সাক্ষী হয়ে এখন প্রকল্পটির কঙ্কাল উপজেলা পরিষদের ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। সুনামগঞ্জের শাল্লায় দেশের বৃহত্তম সোলার মিনি—গ্রিড প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছিলো, ২০১৬—১৭ বছরে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সোলার মিনি—গ্রিড স্থাপন করা হয়। এর উৎপাদন ক্ষমতা ছিলো ৬৫০ কিলোওয়াট। এই গ্রিড থেকে পাশ^র্বর্তী কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুতের লাইনও দেয়া হয়েছিলো।

 

 

৫০০ পরিবার ছিলো এই প্রকল্পভুক্ত। কিন্তু একই ধরনের অবহেলা অর্থাৎ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই বৃহত্তর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটিও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অনুসন্ধান করলে সারা দেশেই এমন নষ্ট হওয়া সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বহু উদাহরণ হাজির করা যাবে। এই যে একবার বিশাল অর্থ খরচ করে একটি প্রকল্প শুরু করা হয়, পরে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থার অভাবে সেগুলো বিনষ্ট হয়ে যায়; এর আসল কারণ কী ? মূলত আমাদের আমলাতান্ত্রিক প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় যেকোনো নতুন প্রকল্প তৈরি এবং এর বিপরীতে বিদেশি সাহায্য, ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নের বিষয়ে যতোটা আগ্রহ দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সেটিকে টেকসই রাখা নিয়ে ততোটাই নিস্পৃহতা লক্ষণীয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের এমন অবস্থা এখনও সরকারি প্রশাসনে একইরকমভাবে জায়মান আছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে না এগোলে আমাদের সকল উন্নয়নই স্থায়িত্ব লাভের পরিবর্তে অকাল মৃত্যুবরণ করবে।

 

 


বর্তমান সরকার জীবাশ্ম জ¦ালানি নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ইতোমধ্যে দেশের সকল জেলা পরিষদকে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসিয়ে নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। জ¦ালানি নির্ভর বিদ্যুতের প্রায় শতভাগ জ¦ালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যেরকম যুদ্ধপরিস্থিতি বিরাজমান, তাতে সামনের আরও বহুদিন জ¦ালানি আমদানিতে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হবে। তাছাড়া জ¦ালানি আমদানি করতে প্রয়োজন হয় বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। এর পরিবর্তে যদি আমরা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিতে পারি তাহলে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে জাতীয় সক্ষমতা জোরদার হবে। আমাদের দেশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সম্ভাবনা প্রচুর। জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকলে আমাদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ জাতীয় উৎস থেকে উৎপাদন করা কঠিন নয়। সরকারকে ওই লক্ষ্যপানেই ধাবিত হতে হবে। 
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ অনেক বেশি বলে প্রায়শঃই অভিযোগ শোনা যায়। এই খরচ কীভাবে কমিয়ে আনা যায় তা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা দরকার। সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকটিও গভীর গবেষণার বিষয়। এই দুই জায়গায় উন্নতি করা গেলে ব্যক্তি পর্যায়েও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে। যাহোক, শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের বিনষ্ট হওয়া সৌর প্যানেলটি অবিলম্বে সচলকরণের ব্যবস্থা এবং এর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো দাঁড় করানোর জন্য আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। জ¦ালানিনির্ভর বিদ্যুতের উপর নির্ভরতা যতো হ্রাস করা যাবে ততো বিদ্যুৎবিভ্রাট কমে আসবে। এই জায়গায় আমাদের সফল হতেই হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার