প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৯
গণমাধ্যমের সংবাদ মোতাবেক, মঙ্গলবার দুদকের জালে আটকা পড়েছেন চ্ট্টগ্রাম জেলার পাহাড়তলি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সাব—রেজিস্ট্রার আব্দুস সোবহানসহ ওই অফিসের আরও দুই কর্মচারি। দুদকের তথ্য মতে, জনৈক আইনজীবী অভিযোগ করেন দু’টি বৈধ অংশীদারী চুক্তি রেজিস্ট্রি করতে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয় সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে। ঘুষের ওই টাকা লেনদেনের সময় দুদক তাঁদের হাতনাতে ধরে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলির এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং সারা দেশের সাবরেজিস্ট্রি অফিস সমূহের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের নিকট থেকে অহরহ শোনা যায়। জমি নিবন্ধনে এই অফিসের সুনামের পরিবর্তে দুর্নামই বেশি পাওয়া যায়। পদে পদে অস্বচ্ছতা ও দুর্ভোগের কথা সর্বজনবিদিত। সাবরেজিস্ট্রি অফিসসমূহের এহেন দুর্নীতি প্রতিহত করে এখানে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ দেখা জমির ক্রেতা—বিক্রেতা এবং দাতা—গ্রহীতাদের একান্ত আকাক্সক্ষা। সম্প্রতি সরকার জমি নিবন্ধনে অটোমেশন প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।
২০২৫ সন থেকে এই প্রকল্প শুরু হয়েছে। ২০৩০ সনের মধ্যে সারা দেশের সকল সাবরেজিস্ট্রি অফিসের ভূমি নিবন্ধন অটোমেশনের আওতায় আসবে বলে জানা গেছে। সরকারের ভূমি অফিসগুলোতে (এসি ল্যান্ড ও তহসিল অফিস) ইতোমধ্যে অটোমেশন পদ্ধতির সফল প্রয়োগ ঘটেছে। জমির দাতা—গ্রহীতাগণ এর সুফল পাচ্ছেন। জমির নামজারি, নামখারিজ, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ প্রভৃতি কার্যক্রম এখন সহজেই অনলাইনে সম্পাদন করা যাচ্ছে। ভূমি অফিসে অটোমেশন করার পর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে অটোমেশন করার পদক্ষেপ বর্তমান সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সাবরেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে যে দুর্নীতির চক্র গড়ে উঠেছে তা অনেকটাই দূর হবে বলে মানুষ বিশ^াস করেন, এতে নিবন্ধন সেবার বর্তমান জটিলতা দূরিভূত হয়ে সহজিকরণ হবে। তবে ইতোমধ্যে সরকারের এই জনহিতকর প্রকল্পের বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠী সরব হয়েছেন। দলিল—লিখকদের অভিযোগ সরকারের এই পদক্ষেপের কারণে তাঁরা পেশাচ্যুত হবেন। অথচ প্রকল্প কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বলা হয়েছে, দলিল—লিখকরা এতে কর্মচ্যুত হবেন না, বরং তাঁদের কাজের প্রক্রিয়া বদলাবে। বাংলাদেশের অনেক সেবা আগে যেগুলো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে করা হতো, সেগুলো এখন অনলাইনে হচ্ছে। একটি পদ্ধতি যখন পরিবর্তিত হয় তখন সংশ্লিষ্ট খাতে কিছু অদল—বদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। তখন নতুন পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে আরও বহু পেশা গড়ে উঠে। ভূমি অফিসের অটোমেশন পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে অনেক ছোট ছোট কম্পিউটার দোকানের উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। এতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষের অসুবিধা হবে বলে উন্নততর পদ্ধতির আগমন ঘটানো যাবে না, এমন অযৌক্তিক দাবি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
জমি ক্রয়—বিক্রয় ও হস্তান্তর প্রক্রিয়ার অটোমেশন হলে সাধারণ মানুষ সহজে এবং দ্রুত নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন। নিবন্ধনের জন্য প্রযোজ্য ফি ও অন্যান্য খরচও তখন যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। এখন যেমন যার নিকট থেকে যেমন ইচ্ছা টাকা আদায় করা হচ্ছে, এর কতটুকু সরকারি খাতে জমা হয় এবং কতটুকু অন্যবিধ উপায়ে গায়েব করা হয়; সেই অস্বচ্ছ প্রবণতা বন্ধ হবে। নিবন্ধন নিয়ে জাল—জালিয়াতি, প্রতারণা ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অনেক কমে আসবে। এমন একটি জনহিতকর প্রকল্প বাস্তবায়নে গোষ্ঠী বিশেষের আপত্তি প্রচলিত দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো বহাল রাখার পক্ষে ভূমিকা রাখে। দুনিয়া এখন সর্বতোভাবে অটোমেশন প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে। আমাদের দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশে এখনও জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনলাইনের পরিবর্তে ম্যানুয়ালি হয় আমাদের জানা নেই। আমাদের দেশের সরকারি সেবাখাতের অনেকগুলো এখনও অটোমেশনের বাইরে। সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিৎ সকল সেবাকে অনলাইন প্লাটফরমে রূপান্তর করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিহীন পরিবেশের ব্যবস্থা করে জনগণের কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছে দেয়া। প্রযুক্তি বদলায়, বদলানোর ধারাবাহিকতায় খাপ খাইয়েই মানবসভ্যতা বিকশিত হয়েছে। সুতরাং নতুন ব্যবস্থাকে ভয় পেয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করে নিজেদের আরও সৃৃজনশীল জায়গায় পৌঁছানোই সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। নতুবা চট্টগ্রামের পাহাড়তলির মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
সরকারের বিভিন্ন পরিষেবা নিয়ে জনমনে যে অসন্তুষ্টি ও হতাশা বিরাজমান তা ধীরে ধীরে দূর করে জনসন্তুষ্টি অর্জনের দিকে এগিয়ে যাওয়া গণবান্ধব সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রমকে অটোমেশন করা ওই যাত্রাপথের একটি ছোট পদক্ষেপ মাত্র। আমরা সরকারের এই গণবান্ধব প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই। একইসাথে কামনা করি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সকল পক্ষ যাতে এই কাজে সহায়তা করেন।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন