প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৩
বুধবার জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের পাশ^র্—অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ প্রস্তাব পেশ করেছেন। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ লাখের উপর। এটি নিবন্ধিত সংখ্যা। নিবন্ধনের বাইরে থাকা সংখ্যাটিও কম হওয়ার কথা নয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আশ্রয়, বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মিটাতে বাংলাদেশের মতো স্বল্প অর্থনীতির দেশকে এখন হিমসিম খেতে হচ্ছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশির দশক থেকে শুরু হওয়া এই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সর্বশেষ ২০১৭ সনে ব্যাপকতা পায়। তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিকতার প্রশ্নটিকে সামনে এনে বিতাড়িত মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশও মানবিক বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারেনি বলে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়। শরণার্থী—সমস্যা কেমন ভয়াবহ ও অমানবিক, ১৯৭১ সনের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ভালো করে বুঝেছে। সে সময় ভারতে প্রায় এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলো। বাংলাদেশের এই মানবিক উদারতা এখন দেশের জন্য গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাঁদের সহায়তার জন্য তহবিল দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলো, তাঁরা এখন সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ৯৩৪.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মানবিক সহায়তার চাহিদার বিপরীতে অর্ধেকেরও কম তহবিল মিলেছে। এক সময় রোহিঙ্গাদের জন্য মাথাপিছু মাসিক বরাদ্দ ছিলো ১২ ডলার, ক্রমান্বয়ে তা ১০ ডলার পরে ৮ ডলারে নামানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশ সরকারকে এখন গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান কামনা করে অনুপ্রবেশকারীদের নিজের দেশে প্রত্যাগমনের পরিবেশ তৈরির তাগাদা দিলেও সে বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। মাঝে—মধ্যে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিবে— এমন আশ^াস পাওয়া গেলেও বাস্তবে মিয়ানমার সরকারের অনীহার কারণে তা আর অগ্রসর হয় না। তাই বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা এই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়টি যথার্থভাবেই প্রধানমন্ত্রী উচ্চপর্যায়ের বৈশি^ক ফোরামে উপস্থাপন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের বিশেষ অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের নিকট সুনির্দিষ্ট পাঁচটি প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে— উপরোক্ত উপায়ে প্রত্যাবাসনের পথনকসা প্রণয়ন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা দূরিকরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রভৃতি। মিয়ানমার দশকের পর দশক ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজে দেশে ফিরিয়ে নিতে একের পর এক অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। এমনকি তারা এও বলার চেষ্টা করেছে যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। ঐতিহাসিক সত্যকে উপেক্ষা করে মিয়ানমার একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের এমন অন্যায্য এবং অন্যায় আচরণ ঠেকাতে বিশ^সম্প্রদায় কার্যত তেমন কোনো ভূমিকা রাখছে না। রোহিঙ্গা সংকটটি কেবল মানবিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল নয়। বরং তাঁদের উপযুক্ত উপায়ে নিজে দেশে ফেরৎ পাঠানোই হলো প্রকৃত সমাধান। এই জায়গায় সফলতা পেতে হলে বাংলাদেশের একক প্রচেষ্টায় তা কখনও সম্ভব নয়। মিয়ানমারের উপর প্রভাব রয়েছে এমন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তির কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন হবে। মিয়ানমারকে ঘিরে আমেরিকা, চীন ও ভারতের ভূ—রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল বিদ্যমান। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে এই তিন দেশের সক্রিয়তা আবশ্যকীয়। আধিপত্য ও বাণিজ্য স্বার্থের চাইতেও যে মানুষের জীবন, একটি জাতিগোষ্ঠীর টিকে থাকার অধিকার ও নিজ দেশে প্রত্যাগমন অধিক জরুরি; বিশ^সম্প্রদায়কে আজ তা বুঝতে হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থই বলেছেন, ‘এখন সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও তার সমাধান খোঁজার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিশ্রম্নতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটানোর সময় এসেছে’।
জাতিসংঘের পাশ^র্—অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রস্তাব আন্তর্জাতিক পরিসরে গভীর আলোড়ন তৈরি করলেই কেবল এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। সে লক্ষ্যে ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে এবং রোহিঙ্গা সমস্যার বিষফোড়া থেকে অবশ্যই বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন