প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২৯
দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু লুটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র নদী ও নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করায় নদী ভাঙন তীব্র হয়েছে। এতে নদীর দুই পাড়ের বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও ফসলি জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ—উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নদী তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। গত শনিবার রাতে বালু উত্তোলনের জন্য আসা একটি নৌকায় স্থানীয় উত্তেজিত জনতা আগুন ধরিয়ে দেন। পরদিন রবিবার সকালে পূর্ব সোনাপুর গ্রামের কয়েকটি বাড়িঘর বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে — এমন অভিযোগ নিয়ে এলাকাবাসী ইউএনওর কাছে অভিযোগ দিতে যান। তবে ইউএনও জেলা সমন্বয় সভায় থাকায় সেদিন তার সঙ্গে তাদের দেখা হয় নি। পরে বিষয়টি দোয়ারাবাজার থানাকে জানানো হয়।
পূর্ব সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা আমির আলী বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নদীর পাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের নাম জানাতে পরামর্শ দিয়েছেন। নদীর কিনারে বালু উত্তোলনের জন্য নৌকা এলে পুলিশকে ফোনে জানানোর কথাও বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় একটি চক্র মরাচেলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। এতে নদীর তীর ভাঙনের পাশাপাশি আশপাশের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চললেও এর সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে নৌকার শ্রমিকদের আটক করা হলেও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে তাদের অভিযোগ।
সরেজমিনে স্থানীয় কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের চিহ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনের কারণে নরসিংপুর ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের বসতভিটা ও ফসলি জমি ধীরে ধীরে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এদিকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সম্প্রতি রহিমের পাড়া ও পূর্ব সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একাধিক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী তীরবর্তী কিছু জমির মালিকও বালু বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র এসব বালু সংগ্রহ করে বিক্রি করছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেওয়া হলেও নদীতে পর্যাপ্ত বালু না থাকায় ইজারাদার বা সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ নদীর তীর কেটে বালু সংগ্রহ করছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায় নি।
স্থানীয়দের দাবি, গত দুই বছর ধরে নদী ও নদীর তীর থেকে বালু উত্তোলনের ফলে সারপিনপাড়া, পূর্ব চাইরগাঁও, পূর্ব সোনাপুর, লোভিয়া, হাবিবনগর, নাছিমপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বসতবাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব সোনাপুর জামে মসজিদ ও পূর্ব সোনাপুর হোসাইনিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসাও রয়েছে বলে তারা জানান।
পূর্ব সোনাপুর গ্রামের আমির আলী বলেন, আমরা গ্রামবাসী দুই বছর ধরে বারবার আন্দোলন করে আসছি। কয়েক দফা মানববন্ধনও করেছি। কিন্তু মরাচেলা নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখছি না।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, মরাচেলা নদী ইজারাবিহীন। অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। সোমবার রাতেও মোবাইল কোর্ট অভিযানে দুইজনকে আটক করা হয়েছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, নদীর পাড় কাটার প্রবণতা বেড়েছে। পাড়ের গ্রামবাসী ভোগান্তিতে পড়েছেন, এটি খুবই সত্য অভিযোগ। যাদুকাটা বন্ধ হওয়ায় বালু খেকো বা ড্রেজার চালকরা এখানে ঝুঁকেছে। দোয়ারাবাজার উপজেলায় নদীর অবস্থান হলেও যোগাযোগ দূরত্ব অনেক বেশি। ছাতক হয়ে ঘুরে যেতে হয় ওখানে। আর রাতে যেভাবে তান্ডব চলে— এটি মোকাবেলা করতে উপজেলার চেয়েও বেশি সক্ষমতার প্রয়োজন। সোমবার রাতে সহকারি কমিশনার (ভূমি) এর নেতৃত্বে ওখানে অভিযানে প্রায় দশলাখ টাকা জরিমানা হয়েছে। ছাতক নৌ—পুলিশকে এই তান্ডব মোকাবেলায় আরও কঠোর হতে হবে। এছাড়া আর কী করা যায়, সেটিও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে ব্যবস্থা নেবার অনুরোধ জানাবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন