প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:০৮
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের প্রবেশদ্বার হাসন তোরণ থেকে আলফাত স্কয়ার (ট্রাফিক পয়েন্ট) পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার শহরমুখী গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি যেন এখন ধুলার চাদরে ঢাকা। সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা, কোথাও খানাখন্দ, আবার কোথাও চার লেনের কাজের জন্য খুঁড়ে রাখা হয়েছে সড়ক। দীর্ঘদিন ধরে কাজ চললেও ধীরগতির কারণে স্বাভাবিক হয়নি যান চলাচল। এর সঙ্গে বর্ষা শেষ হওয়ার পর বেড়েছে ধুলাবালির প্রকোপ। এতে পথচারী, রোগী, শিক্ষার্থী, চালক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কামারখাল ব্রিজ থেকে ওয়েজখালী পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে চার লেনের সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে। তবে কাজের ধীরগতির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। যানবাহন চলাচলের সময় সড়কের ভাঙা অংশে তীব্র ঝাঁকুনি সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি গাড়ির চাকার সঙ্গে উড়ছে ধুলাবালি
।
সড়কের পাশের দোকানগুলোতেও ধুলার প্রভাব দেখা গেছে। ধুলাবালি থেকে বাঁচতে অনেক পথচারী ও চালককে মুখে কাপড় কিংবা মাস্ক ব্যবহার করতে দেখা যায়। যানবাহন চলাচলের সময় মুহূর্তেই সড়কের ওপর থেকে ধুলার আবরণ উড়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে দোকানদারদের পাশাপাশি পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীরাও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
পুরাতন বাস্টেন্ড সড়কের পাশে রয়েছে হিউম্যান ল্যাব, আলফাত ভবনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন রোগী ও স্বজনেরা আসা—যাওয়া করেন। ভাঙা সড়কের ঝাঁকুনি ও ধুলাবালির কারণে অসুস্থ রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন রোগীর স্বজন ও স্থানীয়রা।
অটোরিকশা চালক সজীম মিয়া বলেন, এই সড়কটি শহরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোর একটি। তাই এ সড়কে চলাচলের সময় খুব সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে শিশু, নারী বা রোগী যাত্রী হলে আরও সতর্কভাবে গাড়ি চালাতে হয়। সড়কজুড়ে ধুলাবালি এতো বেশি যে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন। গাড়ি চালানোর সময় নাক, মুখ ও চোখে ধুলাবালি ঢুকে যায়।
পথচারী লোকমান বলেন, সড়কের এক পাশ দিয়ে হাঁটার সময়ও ধুলাবালির কারণে স্বস্তিতে চলাচল করা যায় না। বড় গাড়ি বা অটোরিকশা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধুলার ঝাপটা এসে মুখে লাগে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে মুখ ঢেকে চলতে হয়। দ্রুত সড়কের কাজ শেষ করে ধুলাবালি ও ভাঙাচোরা অবস্থা থেকে মুক্তি চান তিনি।
স্থানীয় দোকানদার সামা এন্টারপ্রাইজ নোমান মিয়া বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানবাহন চলাচলের কারণে দোকানের সামনে সারাক্ষণ ধুলা উড়তে থাকে। দোকানের মালামাল ও আসবাবপত্রে ধুলা জমে যাচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সড়কের কাজ দ্রুত শেষ হলে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে জানান তিনি।
রিকশাচালক সালাউদ্দিন বলেন, ভাঙা সড়কে রিকশা চালাতে গিয়ে প্রতিদিনই ঝাঁকুনি খেতে হয়। রোগী বা বয়স্ক যাত্রী থাকলে আরও সাবধানে চালাতে হয়। আবার ধুলাবালির কারণে সামনে ঠিকমতো দেখা যায় না।
রোগীর স্বজন বদরুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি ভাঙা থাকায় ধুলাবালি, ঝাঁকুনি ও যানজটে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। রোগী নিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে আসার সময়ও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যানজটে অনেক সময় আধা ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়।
তিনি আরও বলেন, নিজের গাড়ি চালিয়ে এই সড়ক দিয়ে আসার সময় গাড়িতেও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। রোগী নিয়ে আসার সময় ভাঙা সড়কের ঝাঁকুনিতে রোগীর কষ্ট আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে কাজ চলায় সাধারণ মানুষ স্বস্তি হারিয়েছেন। দ্রুত ভাঙা অংশ মেরামত ও চলমান কাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।
জেলা মহিলা পরিষদের প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ তৃণা দে বলেন, সুনামগঞ্জ শহরের চার লেন সড়কের সংস্কারকাজ চলছে। কাজের জন্য প্রায় ছয় মাস আগে ভালো সড়ক ভেঙে নতুন করে করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই অংশে এখনো কাজ শুরু হয়নি। ফলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
তিনি বলেন, এসব কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি। বিশেষ করে বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষ এবং স্কুল—কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কের কারণে সমস্যায় পড়ছেন। অসুস্থ রোগী গাড়িতে করে যাওয়ার সময় ভাঙা সড়কের ঝাঁকুনিতে আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।
ওয়েজখালির বাসিন্দা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড সড়কটি সংস্কারের জন্য ভাঙা হলেও ছয় মাসেও সেখানে কাজ শুরু হয়নি। এতে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে অনেকের কোমর ও হাঁটুর ব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত সড়কের কাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শরিফা আশ্রাফী সম্পা বলেন, বাবাকে নিয়ে এই সড়ক দিয়ে আসার সময় রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। চিকিৎসার জন্য মানুষ যে সড়ক দিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে আসছেন, সেই সড়কের ঝাঁকুনি ও ধুলাবালির কারণে রোগীরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
তিনি বলেন, প্রতিদিন শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী হাজারো মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। সড়ক মেরামতের নামে যেন মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। দ্রুত সড়কটি মেরামতের পাশাপাশি ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণেরও দাবি জানান তিনি।
গণমাধ্যমকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে নতুন বাসস্ট্যান্ড ও শহরমুখী সড়কটি সুনামগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। দীর্ঘদিন ধরে কাজের কথা বলা হলেও পুরো সড়কটি এখনো চলাচলের উপযোগী হয়নি।
তিনি বলেন, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শহরের বিপুলসংখ্যক রিকশা, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। ফলে ভাঙাচোরা সড়কের কারণে যানজটও তৈরি হচ্ছে। সড়কের পাশে ব্যাংক, বিমা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড থাকায় এটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। দ্রুত সড়কটি মেরামত এবং চলমান কাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।
অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে ধুলাবালি কিছুটা কম থাকলেও বর্ষা শেষ হওয়ার পর ভাঙা সড়ক থেকে ধুলাবালির ভোগান্তি বেড়েছে। সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা থাকায় রোগীসহ সাধারণ মানুষকে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, সড়কের পাশে একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে এবং প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে আসেন। দ্রুত কাজ শুরু না হলে স্থানীয় বাসিন্দারা সড়ক অবরোধসহ কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবছেন।
তবে সড়কের কাজ নিয়ে ক্ষোভের বিষয়ে জেলা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উপ—বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, সড়কের বিভিন্ন অংশে কাজ চলমান রয়েছে। কামারখাল ব্রিজ থেকে পুরাতন স্ট্যান্ড অংশের বিষয়েও তিনি অবগত হয়েছেন। তিনি বলেন, ওই অংশের কাজও দ্রুত শুরু করা হবে। এক দিক থেকে কাজ এগিয়ে আসছে এবং আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অংশে কাজ ধরার কথা রয়েছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন