প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৩৭
সংগৃহীত ছবি
পাকা চুলকে আমরা বয়স বাড়ার চিহ্ন হিসেবে চিনি। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, এর পেছনে আরও বড় গল্প আছে। চুলের এই রূপালি রং হয়তো ক্যানসারের বিরুদ্ধে শরীরের নিজস্ব লড়াইয়ের একটি চিহ্ন। গবেষণাটি করা হয়েছে ইঁদুরের ওপর।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোষের ক্ষতি সামলানোর কৌশলের সঙ্গে চুলের রং হারানোর যোগ আছে। কোষের ক্ষতি বয়স বাড়া এবং ক্যানসার, দুটির ক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা রাখে। বয়স বাড়ার সময় এই ক্ষতি ধীরে ধীরে কোষের কাজ দুর্বল করে দেয়। ক্যানসারে মেরামত না হওয়া বা ত্রুটিপূর্ণ কোষ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। তখন টিউমার তৈরি হতে পারে।
এই আবিষ্কারের কেন্দ্রে আছে মেলানোসাইট স্টেম সেল। এই কোষগুলো চুলের গোড়ার গভীরে থাকে। এরা মেলানোসাইটের ভান্ডার হিসেবে কাজ করে। মেলানোসাইট হলো রং তৈরির কোষ। এই কোষই চুল ও ত্বকের রং ঠিক করে। সাধারণ অবস্থায় স্টেম সেলগুলো চুল গজানো ও ঝরে পড়ার চক্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন মেলানোসাইট তৈরি করে। তাই জীবনের বেশির ভাগ সময় চুলের রং উজ্জ্বল থাকে।
কিন্তু প্রতিদিন আমাদের কোষের ডিএনএ নানা আঘাতের মুখে পড়ে। এর উৎস হতে পারে অতিবেগুনি রশ্মি, রাসায়নিক পদার্থ, এমনকি শরীরের নিজস্ব বিপাক প্রক্রিয়া। এই ক্ষতি বয়স বাড়া এবং ত্বকের ক্যানসার মেলানোমার ঝুঁকি, দুটোই বাড়ায়।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, চুলের গোড়ার মেলানোসাইট স্টেম সেলের ডিএনএ ডাবল স্ট্র্যান্ড ব্রেক নামে এক ধরনের ক্ষতির শিকার হলে কী ঘটে। তখন কোষগুলো ‘সেনো-ডিফারেনশিয়েশন’ নামে একটি প্রক্রিয়ায় যেতে পারে। সহজ কথায়, স্টেম সেলগুলো আর ফেরার উপায় না রেখে পরিণত রঙের কোষে বদলে যায়। এরপর সেগুলো স্টেম সেলের ভান্ডার থেকে হারিয়ে যায়। ধীরে ধীরে চুলে পাক ধরে।
এই সুরক্ষা প্রক্রিয়া শরীরের ভেতরের সংকেতব্যবস্থা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোষগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ক্ষতিগ্রস্ত কোষ স্টেম সেলের দল থেকে সরে গেলে জিনের ত্রুটি জমতে পারে না। ফলে ভবিষ্যতে ক্যানসার ছড়ানোর ঝুঁকিও কমে। এক অর্থে প্রতিটি পাকা চুল শরীরের ছোট্ট এক আত্মত্যাগ। একটি কোষ ক্যানসারে বদলে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে নিজেই সরে দাঁড়ায়।
তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। সব ডিএনএ ক্ষতিতে এই সুরক্ষা প্রক্রিয়া চালু হয় না। গবেষকরা ইঁদুরের মেলানোসাইট স্টেম সেলকে শক্তিশালী ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক ও অতিবেগুনি রশ্মির সামনে রেখেছিলেন। দেখা গেল, এই চাপে স্টেম সেলগুলো সেনো-ডিফারেনশিয়েশন পুরোপুরি এড়িয়ে যায়। উল্টো আশপাশের কলার সংকেত ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে নিজেদের নবায়ন ও ভাগ হতে উৎসাহ দেয়। কোষে জিনের ক্ষতি থাকা সত্ত্বেও এটি ঘটে। এতে মেলানোমা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
অর্থাৎ স্টেম সেলের পরিণতি নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর। একটি হলো ক্ষতির ধরন। অন্যটি হলো আশপাশের পরিবেশের আণবিক সংকেত। রাসায়নিক বা অতিবেগুনি রশ্মির কারণে ডিএনএ ভেঙে গেলে স্টেম সেল সাধারণত নিজেই সরে যায়। এই একই প্রক্রিয়ায় চুল পাকে। কিন্তু ক্যানসার কোষের প্রভাব থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত স্টেম সেলগুলো টিকে যায়। সেগুলো থেকেই মেলানোমা বেড়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে ‘বিপরীতমুখী পরিণতি’ বলেছেন। একই স্টেম সেল পরিস্থিতি অনুযায়ী দুটি একেবারে আলাদা পথে যেতে পারে।
এই গবেষণার ফলে পাকা চুল ও মেলানোমাকে আলাদা বিষয় ভাবা যাচ্ছে না। দুটিই শরীরের পুরোনো এক লড়াইয়ের দুই পরিণতি। সেই লড়াই হলো কলার নবায়ন ও ক্যানসার এড়ানোর ভারসাম্য রাখা। তবে পাকা চুল নিজে ক্যানসারের ঢাল নয়। এটি বরং এমন এক সুরক্ষা প্রক্রিয়ার উপজাত, যা ঝুঁকিপূর্ণ কোষকে সরিয়ে দেয়। উল্টো দিকে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হলে বা ক্যানসারকারী উপাদানের হাতে নষ্ট হলে ক্যানসারের পথ খুলে যায়। বয়স বাড়লে কেন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, এই গবেষণা তা বুঝতেও সাহায্য করতে পারে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতাও জানা দরকার। মূল প্রমাণের বড় অংশ এসেছে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা থেকে। তাই মানুষের মেলানোসাইট স্টেম সেল একইভাবে কাজ করে কি না, তা বুঝতে মানুষের ওপর আরও গবেষণা লাগবে। প্রজাতিতে প্রজাতিতে জৈবিক পার্থক্য থাকে। মানুষের জীবনযাপন ও জিনের জটিলতাও আছে। তাই আমাদের চুল ও ক্যানসারের ঝুঁকির ছবি এত সরল নয়।
তবু এই আবিষ্কার ক্যানসার ও বার্ধক্য নিয়ে গবেষণায় নতুন পথ খুলছে। কোন সংকেত স্টেম সেলকে পরিণত কোষের দিকে ঠেলে দেয় আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাড়তে উৎসাহ দেয়, তা বোঝা গেলে ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসা আসতে পারে। সেই চিকিৎসা শরীরের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকে আরও শক্ত করবে। এতে বয়স বাড়ার সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকিও কমতে পারে।
আরও একটি দিক আছে। অনেকে স্পষ্ট ঝুঁকির কারণ ছাড়াই কেন মেলানোমায় আক্রান্ত হন, এই তথ্য তা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে বেশি বয়সে ক্যানসার ও কলার ক্ষয় কেন প্রায়ই একসঙ্গে দেখা দেয়, তারও ব্যাখ্যা মিলতে পারে।
পাকা চুলের গল্প তাই শুধু সৌন্দর্য বা সময়ের গড়িয়ে যাওয়ার নয়। এটি বিবর্তন, মানিয়ে নেওয়া এবং শরীরের ভেতরের প্রহরীদের অক্লান্ত নজরদারির গল্প। বার্ধক্য ও ক্যানসারের লড়াইয়ে পুরো শরীরকে বাঁচাতে একটি রঙের কোষকে বিসর্জন দেওয়াও হয়তো সার্থক।
সূত্র: যুগান্তর .কম
বিশেষ সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন