প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১৪
'কয়দিন পরে আর ডিম বেচতে পারতামনা গো মাই! ডিম বেচলে এখন থাকি চান্দা (চাঁদা) দেওয়া লাগবো!'
অনেকটা অনুযোগের সুরে এভাবেই বলছিলেন ডিম বিক্রেতা। তিনি ডিম ফেরি করে বিক্রি করেন। সুনামগঞ্জ শহরের এক ডিমের আড়তদারের হেনস্তার শিকার সে এর আগেও হয়েছে। রবিবার গায়ে হাত তুলেছে তার। ঘটনাটি সুনামগঞ্জ শহরের বড়পাড়া এলাকার। লোকটির শেষ কথা, 'তারা সরকার তাকি লিজ নিছে। তারা একটা কার্ড দিব। এইটা না থাকলে ডিম বেচতে পারতমনা। আমার কার্ড নাই দেইককা আমারে আটকাইয়া রাখছিল। থাপা ও দিছে দুইটা। পরে এলাকার মানুষে বাচাইছে।'
সুনামগঞ্জ ছোট শহর। মহল্লাপ্রধান বসতি। বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাড়া-মহল্লায় জিনিসপত্র বিক্রির প্রচলন দীর্ঘদিনের। গ্রাম থেকে কম দামে জিনিস কিনে স্বল্প লাভে শহরে সেগুলো বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। ফেরিওয়ালা নামেই পরিচিত তারা। তাদেরই একদল গ্রামের খামার থেকে ডিম কিনে স্বল্প লাভে শহরে বিক্রি করে। তারা সাধারণত ডিমওয়ালা নামেই পরিচিত। এই স্বল্প লাভেও এবার চাঁদাবাজির থাবা। ডিম প্রতি চাঁদা দিতে হবে ১টাকা। না দিলে ডিম বিক্রি করতে দিবে না। গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা নেই।
ঘটনাটি ঘটেছে শহরের বড়পাড়া এলাকায়। ঝুড়িতে করে ডিম বিক্রি করার কারণে এক ডিমওয়ালাকে আটকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, 'এর আগেও আমাকে একবার আটকে হেনস্তা করেছেন একই ব্যাক্তি। তিনি শহরের জগন্নাথবাড়ি সড়কে ডিমের আড়তদার। আজকে আবার ডিম বিক্রির জন্য নিয়ে আসলে আমাকে আটকে হেনস্তা ও হুমকি দেওয়া হয়। আমার কাছে কার্ড চাইলে আমি অপরাগতা প্রকাশ করলে এক পর্যায়ে আমার গায়ে থাপ্পড় মেড়ে আমাকে হুমকি দেন আমি যেনো উনার ছেলের থেকে কার্ড নিয়ে আসি। উনারা শহরের ডিম বিক্রির লিজ নিয়েছেন। কার্ড না নিলে এবং ডিম প্রতি ১টাকা না দিলে আমি ডিম বিক্রি করতে পারবো না।'
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ডিমের আড়তদার হাবিবুর রহমান হবির সাথে কথা বললে তিনি ঘটনাটি অস্বীকার করেন। তবে তার ভাষ্য থেকে ঘটনার কিছু রেশ মেলে। হবি বলেন, 'ডিম বা অন্যান্য পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে কারো কাছ থেকে জোরপূর্বক অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা মাইরধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মাইরধোর বা জোরজুলুমের কোনো প্রশ্নই আসে না, এমন কিছু কখনো ঘটেনি।'
তিনি আরও বলেন, 'পৌরসভার ভেতরে ব্যবসা করতে হলে নিয়ম অনুযায়ী বাৎসরিক ট্যাক্স বা নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করতে হয়। পাড়া—মহল্লায় এসে যারা ডিম বেচে যায়, তাদেরও এই পৌরসভার নিয়মের আওতায় থাকা উচিত। পৌরসভা থেকে বাৎসরিক টোকেন বা ইজারার বিষয়গুলো প্রতি বছরই নিয়ম মেনে সম্পন্ন করা হয়। ডিম, মোরগ ও ফল বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী একত্রিত হয়ে প্রতি বছর পৌরসভার নির্ধারিত টাকা জমা দিয়ে টোকেন বা অনুমতি সংগ্রহ করেন।
বাজার ও পৌরসভার সুবিধা নিয়ে যারা ব্যবসা করছেন, তাদের পৌরসভার নিয়ম মেনে টোকেন নিয়ে বেচাকেনা করা উচিত। তাদের এই কার্যক্রম কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা পাড়ার জন্য নয়, বরং পুরো পৌরসভার আওতাধীন সকল ব্যবসার জন্য প্রযোজ্য।'
পৌরসভা থেকে পাড়া-মহল্লায় ডিম বিক্রেতাদের থেকে এরকম কোনো টোকেন বা কার্ডের আইন আছে কি না জানতে কথা হয় সুনামগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম কয়েসের সাথে। তিনি বলেন, 'পৌরসভার বাইরে থেকে এসে পাড়া মহল্লায় ডিম বিক্রেতাদের থেকে কোনো টোকেন নিতে হয় না। তাদের জন্য কোনো বার্ষিক ইজারার ব্যবস্থাও নেই। পৌরসভার বাজারে যারা ডিম বিক্রি করেন, মূলত তাদের জন্যই বাজার ইজারার ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, পৌরসভার বাইরে এসে সরাসরি ডিম বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ইজারা বা টোকেনের ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ বাজারের বাইরে সরাসরি ডিম বিক্রির ওপর পৌরসভার পক্ষ থেকে কোনো ট্যাক্স বা ইজারা নেওয়া হয় না।'
তিনি আরও বলেন, 'পৌরসভা বছরে একবার বাজার ইজারা দেয়। বাজারে যারা বসেন, তাদের বিষয়টি ইজারার আওতায় থাকে।'
আড়তদারের এ রকম নজরদারির ঘটনা বাড়লে বিষয়টি চাঁদাবাজি হিসেবেই প্রচলিত হওয়ার শংকা থাকে বলে মনে করছেন মহল্লাবাসী।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রতন শেখ বলেন, 'ডিম বিক্রেতা চাঁদাবাজি ও হুমকির অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন