প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৩৯
একই উপজেলার কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৮৫ শিক্ষার্থীর জন্য সহকারী শিক্ষক মাত্র একজন, কোথাও ১৩৩ শিক্ষার্থীর জন্য একজনও নেই। আবার সেই উপজেলারই অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক এলাকার একটি বিদ্যালয়ে ২০ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে ৫ জন সহকারী শিক্ষক। কোথাও ৪৫ শিক্ষার্থীর বিপরীতে পাঁচজন আবার ৫৪ শিক্ষার্থীর জন্যও পাঁচজন। শিক্ষক সংকটের এই চিত্রের পাশাপাশি এমন অসম বন্টন দুর্গম হাওরের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক পদায়নের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ধর্মপাশা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ১১০ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তালিকা অনুযায়ী এর মধ্যে ৩৭ টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ৮১টি পদ শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ১৭০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮৯ জন। তবে শূন্য পদের বড় অংশই হাওরবেষ্টিত ও দুর্গম দুইটি ইউনিয়নে।
সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ রয়েছে সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নে। ১৫ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে তালিকাভুক্ত ১২ টিতে অনুমোদিত ৫৫ টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৭ জন। ৩৮টি পদই শূন্য রয়েছে। সরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪টি অনুমোদিত সহকারী শিক্ষক পদের একটিতেও শিক্ষক নেই। সুখাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬টি পদের ৫টি, কাজিরগাঁও ও নওয়াগাঁও মলয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫টি করে পদের ৪টি করে শূন্য।
জয়শ্রী ইউনিয়নেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩ টিতে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ৬২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৩ জন। ২৯ টি পদই শূন্য। স্বরস্বতীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কোনো সহকারী শিক্ষক নেই। মহেশপুরে ৪ টি পদের বিপরীতে আছেন ১ জন। জয়শ্রী, বানারশিপুর, সাদীপুর, শান্তিপুর, সানবাড়ি ও বাদেহরিপুর সহ আরও কয়েকটি বিদ্যালয় একাধিক পদ খালি রয়েছে।
উপজেলার ৩৭ টি বিদ্যালয়ের ৮১ টি শূন্য পদের মধ্যে শুধু সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ও জয়শ্রী ইউনিয়নেই রয়েছে ৬৭টি পদ খালি। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত শূন্যপদের ৮৩ শতাংশের বেশি এই দুই ইউনিয়নে। এর বাইরে সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণে ৬টি, সদর ইউনিয়নে ২টি, সেলবরষে ২ টি এবং পাইকুরাটিতে ৪ টি পদ শূন্য রয়েছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা তুলনা করলে বৈষম্যটি আরও স্পষ্ট হয়। সুখাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫৫ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সহকারী শিক্ষক একজন। বাখরপুরে ১৩২ শিক্ষার্থীর জন্য দুইজন, পাথারিয়াকান্দায় ৫১ শিক্ষার্থীর জন্য একজন, তেলীগাঁওয়ে ৫২ শিক্ষার্থীর জন্য একজন এবং খলাপাড়ায় ৯১ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। সরস্বতীপুরে ১২৯ ও সরিষাকান্দা ইসলামপুরে কোনো সহকারী শিক্ষক নেই। মহেশপুরে ১৪০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন একজন।
অন্যদিকে তুলনামূলক সুবিধাজনক এলাকার কয়েকটি বিদ্যালয়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। পাইকুরাটি ইউনিয়নের বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন ৫জন সহকারি শিক্ষক। মাসকান্দায় ৪৫ শিক্ষার্থীর বিপরীতে পাঁচজন, সুনই কান্দাবাড়িতে ৫৪ শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। সদর ইউনিয়নের মগুয়ারচর ও জানিয়ারচরে ৬০ ও ৫৪ শিক্ষার্থীর বিপরীতে পাঁচজন করে এবং দুধবহর জয়তুন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে চারজন সহকারী শিক্ষক রয়েছেন। সেলবরষের কাকিয়াম মৌলভীপাড়ায় ৬৩ শিক্ষার্থীর বিপরীতে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত আছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্মপাশা সদর, সেলবরষ ও পাইকুরাটি তুলনামূলক যোগাযোগসুবিধা সম্পন্ন হওয়ায় এসব এলাকায় শিক্ষকরা পদায়ন নিতে আগ্রহী। বিপরীতে সুখাইড় রাজাপুর উত্তর, জয়শ্রী ও সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণে বেশিরভাগ বিদ্যালয় হাওর বেষ্টিত ও দুর্গম। এ কারণে সেখানে পদায়ন নিতে অনীহা থাকে। আবার বদলির সুযোগ পেলেই সুবিধাজনক এলাকায় চলে যাওয়ার ফলে সংকট কাটছে না।
সম্প্রতি ধুবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক মারা গেছেন। নওধার ও সুনই কান্দাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন করে শিক্ষক অধিদপ্তর থেকে বদলি হয়েছেন। ফলে আরও তিনটি পদ খালি হয়েছে।
এ অবস্থায় গত ১ অক্টোবর প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। ধর্মপাশার ৪৯ জনের মধ্যে ৪৬ জন শিক্ষক জেলা শিক্ষা অফিসে যোগ দিয়েছেন। গত রবিবার উপজেলা পর্যায়ে তাদের পাঁচ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। আগামী ১১ তারিখ তাঁদের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শূন্য পদে পদায়নের আদেশ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এবার নতুন শিক্ষকদের পদায়নে দুর্গম হাওরে সংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলো কতটুকু গুরুত্ব পায় সেটিই হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, হাওরের শিশুরা যাতে শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, নতুন শিক্ষকদের পদায়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। দুর্গম এলাকায় শিক্ষক ধরে রাখার জন্য যাতায়াত ও আবাসন সুবিধার ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন।
সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সোহেল মিয়া বলেন, উপজেলা সমন্বয় সভায় একাধিকবার তাঁর ইউনিয়নের শিক্ষার বেহাল অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয় নি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহন লাল দাস বলেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পদায়ন লটারির মাধ্যমে হবে। এজন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। শিক্ষক সংকটের বিষয়টি কমিটির বিবেচনায় থাকবে।
দুর্গম হাওরে শিক্ষক সংকট ও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের পদায়নের বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শিক্ষা ও আইসিটি শাকিলা রহমান বলেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হবে। তবে যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট তুলনামূলক বেশি, সেসব বিদ্যালয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর তালিকা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন