প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৪০
জেলার বালু মহালগুলোতে লুটের মহোৎসব চলছে। লুট ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে টাস্কফোর্সের অভিযান শুরু হয়েছে। রবিবার থেকে শুরু হওয়া টাস্কফোর্সের এই অভিযান লাগাতার এক সপ্তাহ চলবে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসন সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় ছাতকের মরাচেলা নদী ও তাহিরপুরের যাদুকাটা নদী নিয়ে। এই মহালগুলো ইজারা না থাকায় এবং জেলা প্রশাসন থেকে দূরবর্তী হওয়ায় দিনে ও রাতে বালু লুট চলছে।
সুনামগঞ্জের আলোচিত বৃহৎ বালুমহাল যাদুকাটা নদীতে আগামী ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েছিল জেলা প্রশাসন। এসময় নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিপরীতে সরকারি রাজস্ব আদায় করার সিদ্ধান্ত ছিল। ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ায় গেল ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এরপর ২০ সেপ্টেম্বর যাদুকাটা—১ এর আগের ইজারাদার মাহিয়া স্টোন ক্রাশায়ের নাছির উদ্দিন ১৯৫ দিনের জন্য সরকারি ইজারা নেবার জন্য আবেদন করেছিলেন। যাদুকাটা—২ এর সাবেক ইজারাদার জিনান এন্টার প্রাইজের মালিক শাহ্ রুবেলও একই দিনে ১৯৫ দিনের জন্য ইজারা নেবার আবেদন করেন। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষের নির্দেশে আগের ইজারাদার নাছির উদ্দিনকে ৪৫ কোটি রাজস্ব দেবার শর্তে দুটি মহালই তাকে বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা অনুমোদন করা হয়। এই অনুমোদন চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট (রিট পিটিশন নম্বর ১৩৮৮০/২৬) দায়ের করেন। আদালত ২৯ সেপ্টেম্বর নাছির মিয়ার পাওয়া অনুমোদন পত্রটি তিন মাসের স্থগিত করেন। এই অবস্থায় যাদুকাটা এখন ইজারাবিহীন রয়েছে।
যাদুকাটার পাড়ের একাধিক বাসিন্দা জানান, ইজারা কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও ওখানে বালু লুট ঠিকই চলছে। চলছে পাড় কাটাও।
জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদী থেকেও অবৈধভাবে বালু লুট চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র নদী ও নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করায় নদী ভাঙন তীব্র হয়েছে। এতে নদীর দুইপাড়ের বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও ফসলি জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ—উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নদী তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় একটি চক্র মরাচেলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। এতে নদীর তীর ভাঙনের পাশাপাশি আশপাশের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চললেও এর সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে নৌকার ¤্রমিকদের আটক করা হলেও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে তাদের অভিযোগ।
মরাচেলা নদীর কাজীর কাজিরগাঁও এলাকায় রোববার অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে জেলার অন্যতম বালু পাথর মহাল সুনামগঞ্জ শহরতলির ধোপাজানেও লুট ঠেকাতে এবার সিসি ক্যামেরায় নজরদারী করছে পুলিশ। বালু পাথর মহাল সিসি ক্যামেরায় নজরদারী দেশে এটাই প্রথম। ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট পটপরিবর্তনের ইজারাবিহীন এই বালু মহাল কয়েকদফায় লুটপাট হয়। তাতে কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয় সরকার।
দেশের উত্তর—পূর্বাঞ্চলের শেষ সীমানা ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমেছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা চলতি নদী, এর প্রবেশ মুখেই জেলার একমাত্র বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ধোপাজান। স্থানীয়দের জীবন—জীবিকা আর পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৮ সালে কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে আদেশ দেন আদালত। দীর্ঘবছর বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর শুরু হয় হরিলুট। লুট বন্ধ না করে উল্টো বিভিন্ন অভিযোগে প্রত্যাহার হন তৎকালীন এসপি আনোয়ার হোসেন। এরপর প্রশাসন তৎপর হলে বন্ধ হয় বালু উত্তোলন।
বালুমহালে উত্তোলন বন্ধ থাকলেও সরকারি সিদ্ধান্তে গেল বছরের অক্টোবর মাসে নদীতে চলে বালু উত্তোলন। কিছুদিন ওখানে নানা কায়দায় লুট হয় শতকোটি টাকার বালু। ইজারাবিহীন এই বালু মহালে এখনো নানা কায়দায় লুট চলছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের কাছে সোমবার সুনামগঞ্জের বালু মহালগুলোর বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে বলেন, সুনামগঞ্জে সরকার অনুমোদিত ৪টি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে খাসিয়ামারা বালুমহাল নিয়ে কোনো বড় ধরনের সমস্যা নেই। তবে চলতি ( ধোপাজান) মরাচেলা এবং যাদুকাটা বালুমহাল নিয়ে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহালের নতুন ইজারা প্রক্রিয়া আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ইজারা শুরুর পূর্ববর্তী সময়ে খাস আদায়ের বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি আদালতে রিট করার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। রিট পরবর্তী পদক্ষেপে করণীয় বিষয়ে জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যেই সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে এবং দ্রুতই সিদ্ধান্ত জানানোর আশ^াস দেওয়া হয়েছে।
অবৈধ বালু চুরি ও টাস্কফোর্স অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে ইজারাদার না থাকার সুযোগে কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বালু চুরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)—এর নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। মরাচেলা এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান চলছে। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম)—এর উদ্যোগে আগামী এক সপ্তাহ টানা টাস্কফোর্স অভিযান চালাবে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি খবরে মহালগুলোর ইজারা প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যগণের ঘনিষ্টরা রয়েছেন উল্লেখ করা হয়েছে। ওখানে জেলা প্রশাসককে উধ্বৃত করা হয়েছে। এই বিষয়ে জেলা প্রশাসকের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মন্তব্য এখানে অতিরঞ্জিত এবং আংশিক বিকৃত করা হয়েছে। আমি কোন সংসদ সদস্যকে কথায় যুক্ত করি নি। প্রশাসনের কার্যক্রম চালাতে গিয়ে আমরা দেখেছি, ‘সুনামগঞ্জ সদরের সংসদ সদস্য মহোদয় (সুনামগঞ্জ—৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. নুরুল ইসলাম নুরুল) অত্যন্ত সজ্জন এবং দায়িত্বশীল একজন ব্যক্তি। তিনি স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা—কর্মচারীদের প্রশাসনিক কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করেন। এমপি মহোদয়দের নাম এই ধরনের মন্তব্যের সাথে জড়িয়ে প্রচার করার কোন অবকাশ নেই।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন