প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৯
তাহিরপুরে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চার গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের লোকজনের সংঘর্ষের পর সৃষ্ট উত্তেজনা সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের হস্তক্ষেপ ও মধ্যস্থতায় শান্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। পরে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও দোকানপাট পরিদর্শন করেন। এ বিষয়ে আগামীকাল (আজ শুক্রবার) সকাল ১০ টায় জাহানারা স্কুলে বৈঠক হবে।
এর আগে বুধবার (৭ অক্টোবর) মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজন জড়ো হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আহতদের মধ্যে চারজন গুরুতর আহত হয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সংঘর্ষের সময় মধ্য তাহিরপুর গ্রামের কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট এবং একটি বসতঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তাহিরপুরের বাসিন্দা সুনামগঞ্জ—১ আসনের (তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও মধ্যনগর) আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল যুক্তরাজ্যে ছিলেন। গত বুধবার তিনি দেশে ফেরেন। বৃহস্পতিবার সকালে উত্তেজিত লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হলে সংসদ সদস্য ঘটনাস্থলে যান। বীরনগর, জয়নগর, লক্ষীপুর ও ধুতমা গ্রামের লোকজন এবং মধ্য তাহিরপুর গ্রামের উত্তেজিত বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং নতুন করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনায় না জড়ানোর অনুরোধ করেন। তিনি নিজেও একটি লাঠি হাতে নিয়ে তরুণ—যুবকদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেন। তাঁর মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমে আসে। পরে এমপি কামরুজ্জামান কামরুল সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি দ্রুত উভয় পক্ষের লোকজনকে নিয়ে বসে বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেন।
জানা যায়, প্রায় এক সপ্তাহ আগে বীরজয়—লক্ষী—ধুতমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ক্রিকেট খেলার সময় একটি বল মধ্য তাহিরপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক জালাল মিয়ার অটোরিকশায় গিয়ে পড়ে। এ নিয়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের হাফিজ মিয়ার সঙ্গে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এর জেরে ধুতমা গ্রামের জসিম উদ্দিনকে তাহিরপুর বাজারে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের কয়েকজন মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠে। পরে হাফিজ মিয়াকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারধর করা হয়েছে বলেও তার পক্ষের লোকজন অভিযোগ করেন। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার রাতে বীরনগর গ্রামের একটি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। বুধবার সকালে বীরনগর, জয়নগর, লক্ষীপুর ও ধুতমা গ্রামের লোকজন একত্রিত হয়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের দিকে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় মধ্য তাহিরপুর গ্রামের চারটি দোকানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট এবং একটি বসতঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠে। পরে চার গ্রামের লোকজন ফিরে যাওয়ার সময়ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন।
আহতদের মধ্যে বীরনগর গ্রামের ওয়াজ আলীর ছেলে মাইনুদ্দিন (৩৫), সুবাহানের ছেলে আশিষ মিয়া (৪০), আলীমের ছেলে রেজাউল (৩৫) ও নবী হোসেনের ছেলে খোকন মিয়া (৩৬) গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মধ্য তাহিরপুর গ্রামের তানিম আহমদ লিংকন বলেন, চার গ্রামের লোকজন মাইকে ঘোষণা দিয়ে আমাদের গ্রামে হামলা চালিয়েছে। বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। একটি বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। আজ সকাল থেকেও পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। এমপি কামরুজ্জামান কামরুল দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বিচার—সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। আপাতত পরিস্থিতি শান্ত আছে। আমরা এর উপযুক্ত বিচার চাই।
বীরনগর গ্রামের জমাদার মিয়া বলেন, সংঘর্ষে আমাদের চারজন গুরুতর আহত হয়ে সিলেটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সকালে এমপি সাহেব আমাদের সবার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন এবং সবাইকে শান্ত থাকতে বলেছেন।
জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা ও তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, সংঘর্ষের পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ভোর থেকে আবার সংঘর্ষ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সকালে এমপি সাহেব এলাকায় আসায় পরিবেশ শান্ত হয়েছে। তিনি দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। দ্রুত সবাইকে নিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তাহিরপুর থানার ওসি ফারুক আহমদ বলেন, সংঘর্ষের সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবেশ শান্ত রাখার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন জোরদার করা হয়েছে। নতুন করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ—১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, তাহিরপুরে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা ঘটেছে। আমি এলাকার বাইরে ছিলাম। বিষয়টি শোনামাত্রই এসপি ও ওসির সঙ্গে কথা বলেছি। তবুও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আমি বিলম্ব না করে আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে এলাকায় এসে দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরিবেশ শান্ত রাখার চেষ্টা করেছি। দুই পক্ষই আপাতত কোনো সংঘাতে জড়াবে না বলে কথা দিয়েছে। খুব দ্রুত সবাইকে নিয়ে বিষয়টি সমাধান করব, ইনশাআল্লাহ।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন