প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৪
তাহিরপুর সদর সন্নিহিত মধ্য তাহিরপুরের একটি এলাকার অধিবাসীদের সাথে পাশ^র্বর্তী বীরনগর, জয়নগর, লক্ষ্মীপুর, ধুতমা গ্রামবাসীর হামলা ও সংঘর্ষ একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত, অনভিপ্রেত ও হতাশাজনক। বাচ্চাদের ক্রিকেট খেলার মতো একটি তুচ্ছ ঘটনাকে উপলক্ষ করে রীতিমতো আগের রাতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এই সংঘর্ষ পরিচালিত হয়েছে বলে গণমাধ্যমের সংবাদে দেখা যায়। যুথবদ্ধ জনপদে বিরোধ—বিসম্বাদ—মতানৈক্য থাকা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। এর সামাজিক সমাধানের পথও আছে। কোনোকিছু নিয়ে বিরোধ হলেই তাকে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে পরিণত করতে হবে, সভ্য সমাজের জন্য তা একেবারেই বেমানান। আমরা একটি রাষ্ট্রের অধিবাসী। রাষ্ট্রের আইন—কানুন, শৃঙ্খলা ও শাসন প্রণালী আছে। রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যেই বিরোধ নিষ্পত্তির সমাধান খোঁজা উচিৎ। সমাজবদ্ধ মানুষ নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বময় পরিস্থিতি দূর করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য কিছু সামাজিক প্রথা, নিয়ম ও ব্যবস্থা চালু করে রেখেছে। রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর সাথে এই সামাজিক ব্যবস্থাদি এখন পর্যন্ত আমাদের সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। সম্প্রতি প্রায়ই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সামান্য কারণে পরষ্পর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া, মারামারিতে লিপ্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। মানুষ কেন জানি ক্রমশ অসহিষ্ণু প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছে। উছিলা পেলেই নিজেদের দাম্ভিকতা, শক্তিমত্তা, প্রভাব—প্রতিপত্তি দেখাতে মরিয়া হয়ে উঠে। এ—সবের মধ্য দিয়ে কী অর্জন হয় জানি না, তবে সমাজ ও জনপদের শান্তিপূর্ণ সহবস্থান, পারষ্পরিক সদ্ভাব ও সম্প্রীতি যে একেবারে নষ্ট হয়ে যায়— তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বুধবার তাহিরপুর উপজেলা সদরের পাশ^র্বর্তী যে গ্রামগুলোর মধ্যে সহিংস সঘর্ষ ঘটল, নিশ্চিতভাবেই তা দীর্ঘদিনের সহবস্থান ও সম্প্রীতির মনোভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই গ্রামগুলোর লোকজন দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি অবস্থান করছিলেন। পারষ্পরিক সম্পর্কেও যে টানাপোড়েন ছিলো এমন নয়। এই লোকগুলোকে ভবিষ্যতেও একসাথেই বসবাস করতে হবে। সুতরাং চূড়ান্ত সংঘর্ষময় পরিস্থিতি কি আগেভাগে উদ্যোগ নিয়ে থামানো যেতো না ? এই প্রশ্নটি এখন জোরালোভাবে সামনে আসছে। বিশেষ করে মঙ্গলবার রাতে মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয়া হলেও কেন তা এড়ানো গেলো না সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। এমন নয় যে, এলাকাটি দুর্গম। এটি সহকারি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের নিকটবর্তী। তাহিরপুর থানাও বেশি দূরে নয়। সকল প্রশাসনিক পদধারীদের অবস্থানও কাছাকাছি। সম্ভবত সংঘর্ষ থামানোর জন্য যে পরিমাণ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিলো তা নেয়া হয়নি। এ কারণেই সমঝোতার পরিবর্তে সংঘর্ষকে অনিবার্য করে তুলেছে।
বুধবারের ঘটনা যাতে আর বাড়তে না পারে সকলকে এখন সে বিষয়ে বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। এটি কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিবদমান দুই পক্ষের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আন্তরিক প্রচেষ্টা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাথে প্রশাসনিক নজরদারি অবধারিত। মনে রাখতে হবে হিংসা কেবল আরেকটি হিংসাকেই আমন্ত্রণ জানায়। বিবদমান পক্ষগুলোকে ধৈর্য্য ও বিচক্ষণতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। আমরা এখন মধ্যযুগে বসবাস করি না। জোর যার, মুল্লুক তার; এমন ধারণা এখন বিলুপ্ত। এখন আইনের চোখে সকলেই সমান। বুধবারের ঘটনায় বেশ কয়েক ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। অন্তত ৬ গুরুতর আহত ব্যক্তিকে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও ময়মনসিংহের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। উভয় পক্ষেই অনেকে আহত হয়েছেন। প্রশাসনকে দ্রুত এই ঘটনাকে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় নিয়ে এসে ঘটনার কার্যকারণ বের করাসহ দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে এগোতে হবে। এই ঘটনার উপযুক্ত প্রতিকার করতে না পারলে অনুরূপ ঘটনা আরও বাড়তেই থাকবে। বুধবারের ঘটনাটিই ছাইচাপা আগুন হয়ে আবারও বাড়তে পারে। সুতরাং সময় থাকতে সাবধান থাকতে হবে। সবচাইতে বেশি দায়িত্ব সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের। আমরা বিশ^াস করি, এলাকার দায়িত্বশীলরা উদ্যোগ নিলে এই ঘটনার উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি সম্ভব।
মানুষ একা একা বাস করতে পারে না। একা মানুষ মূলত মানুষই নয়। সমাজবদ্ধভাবে সকলকে নিয়ে বসবাস করে বলেই মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। মানুষের এই চিরন্তন অন্তর্গত শক্তির উপর ভরসা রাখতে হবে। এই শক্তিকে বিভক্ত করতে নানা ধরনের উসকানি ও ইন্ধন থাকবে। দায়িত্বশীলদের এ বিষয়ে সচেতন থেকে সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহিরপুরের এই ঘটনা যাতে আর কোনোভাবেই ডালপালা মেলতে না পারে তা নিশ্চিত করাই এখন সকলের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন