প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৩২
জামালগঞ্জে দুর্গাপূজা
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠে মাঠে কাশফুলের দোলা। প্রকৃতিতে এখন শারদীয় দুর্গোৎসবের আবহ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গাকে বরণ করে নিতে জামালগঞ্জে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। চলছে সাজসজ্জা, কারুকাজ ও তোরণ নির্মাণের কাজ। প্রতিমা শিল্পীদের ব্যস্ততাও বেড়েছে কয়েক গুণ।
এ বছর জামালগঞ্জ উপজেলায় ৫৫টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৪৭টি। দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। সার্বিক পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা। তাদের প্রত্যাশা, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে এবারের দুর্গোৎসব।
উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকের প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। মাটির কাজ শেষে এখন চলছে প্রতিমার অলংকরণ ও সাজসজ্জা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন শিল্পীরা।
প্রতিমা কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি প্রতিমায় নিখুঁত কারুকাজ ও আকর্ষণীয় সাজসজ্জা ফুটিয়ে তুলতে তারা নিরলসভাবে কাজ করছেন। পূজার আর মাত্র এক দিন বাকি থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমার সাজসজ্জা ও অলংকরণের কাজ শেষ করতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন তারা। তবে লোডশেডিংয়ের কারণে কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে বলে জানান শিল্পীরা।
দুর্গোৎসব ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রস্তুতি নিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও আনসার বাহিনী। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ, আনসার ও মণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপ ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বন্দে আলী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, উপজেলার সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সনাতন সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে সুন্দর পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পূজা উদযাপন কমিটিগুলোকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা, নিজস্ব জেনারেটরের ব্যবস্থা করা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা প্রস্তুতসহ তাঁদের ভলান্টিয়ার কার্ড সঙ্গে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক কিছু নজরে এলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে।
উৎসব ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে জামালগঞ্জ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সমরেন্দু আচার্য শম্ভু বলেন, দুর্গাপূজা আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। আমরা চাই, সবাই মিলে আনন্দমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপন করতে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত পূজা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও আনসার বাহিনীর সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিকতায় এবারের দুর্গোৎসব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে বলে আমরা আশা করি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রানী মোদক বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আবহমানকাল থেকে আমরা সব ধর্মের মানুষ একে অপরের উৎসবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে আসছি। এবারও আমাদের উপজেলায় শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু থাকবে। গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক দল রাখতে হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখতে হবে। মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ইউএনও আরও বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় মণ্ডপের শব্দ যেন নামাজে বিঘ্ন না ঘটায়, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। ৬ টি ইউনিয়নে ৬ টি কমিটি করা হয়েছে নামাজের সময়সূচি সকল মন্দিরে টানানো থাকবে এবং উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের মোবাইল নম্বর টানানো থাকবে। উপজেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম করা হয়েছে। গুজব প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ যেন উসকানিমূলক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কোনো সন্দেহজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নিজেরা আইন হাতে তুলে না নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করতে হবে। বিসর্জনের দিন নির্ধারিত রুট ও সময় অনুসরণ করে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিমা বিসর্জনের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পূজা উদযাপন পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, এ বছর ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন