ঘুষের মধ্যস্থতাকারী এনায়েত পাটোয়ারি

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৩৮

এনায়েত পাটোয়ারি। তাহিরপুর ইউএনও অফিসে ২০১৮ ইংরেজিতে উদ্যোক্তা হিসেবে যোগদান করেছিলেন। সেই থেকেই ভাগ্য খুলে গেছে তার। গেল আট বছরে তাহিরপুরে ইউএনও যারা এসেছেন, সকলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি আছে তাঁর। আর অসৎ কিংবা দুর্নীতিবাজ ইউএনও হিসেবে যারা দুর্নাম কুড়িয়ে গেছেন, তাদের অর্থ আদায়কারী বা ঘুষ আদায়ের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিতি আছে এনয়েতের। এখনও উদ্যোক্তা হিসেবে ইউএনও কার্যালয়ে সংযুক্ত আছেন এনায়েত। গেল বছরে হাওরের বোর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজের প্রকল্পের স্টেশনারী মালামাল ক্রয় ও আপ্যায়ন খরচসহ আনুষাঙ্গিক বিল বাবদ এক পারসেন্ট (ভাগ) টাকার একটি চেকের আড়াই লাখেরও বেশি টাকা এই এনায়েত আত্মসাত করেছেন বলে কথা উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে এটি চাউর হয়েছে। এ নিয়ে লিখিত অভিযোগও হয়েছে। ইউএনও বলেছেন, ‘এটি নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। এখানে এনায়েতের নাম নেই। তবে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে যেহেতু তার নাম এসেছে, তদন্তে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই তার সঙ্গে কথা বলবেন। আমি নিজেও কথা বলবো।’

 


উপজেলা সদরের মধ্য তাহিরপুরে বাড়ি এনয়েতের। বাবা আরব আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। একসময় চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলায় বাড়ি ছিল তাদের। এখন তাহিরপুর বাজারে ভিট, হাউস বোট ও সুনামগঞ্জ শহরে বাড়ি সবই রয়েছে এনায়েতের। তাহিরপুরের শিক্ষক, সরকারি চাকুরিজীবী, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই এনায়েতের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মন্তব্য ‘অফিসকে দূষিত করেছে এই ছেলে, সকল দুর্নীতিবাজদের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সে’। অথচ সে সরকারি কোন স্টাফ নয়। উপজেলা সদরের প্রভাবশালী সকলের ঘনিষ্ঠ এই ছেলে— মন্তব্য করে এই উপজেলার সাবেক একজন জনপ্রতিনিধি বলেছেন,‘আমি তাকে বাদ দেবার চেষ্টা করে সফল হতে পারি নি।’ এনায়েত পাটোয়ারি অবশ্য এসব অভিযোগের সত্যতা নেই বলে দাবি করেছেন।

 


উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা কর্মকর্তা (এসও) উপ—সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন গেল ৭ অক্টোবর লিখিত অভিযোগ করেন ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে সরকারি টাকা আত্মাসাতের। খেঁাজ খবর নিয়ে দেখা গেছে এর সঙ্গেও এনায়েত জড়িত।

 


লিখিত অভিযোগে উপ—সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন উল্লেখ করেছেন, ২০২৫—২০২৬ অর্থ বছরে সংশোধিত 'কাবিটা নীতিমালা ২০২৩' এর আওতায় তাহিরপুর উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) ক্ষতিগ্রস্ত ডুবন্ত বাঁধ মেরামত কাজের ব্যয় করা অর্থের ১% আনুষাঙ্গিক বিল বাবদ বাবদ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৯ টাকার একটি চেক (চেক নং: ০৯৩০০৯৮) প্রস্তুত করা হয়েছিল।

 


অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে চেকটিতে স্বাক্ষরের পর তিনি (উপ—সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন) উপজেলা কমিটির সভাপতি ইউএনও’র স্বাক্ষরের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। ইউএনও’র স্বাক্ষরের পর চেকটি অফিস সহকারী কাম—কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরি বিশ্বজিৎ সূত্রধরের নিকট পানি উন্নয়ন শাখার দাপ্তরিক কাজে জমা দেওয়ার জন্য রাখা হয়। পরবর্তীতে ওই চেকের বিষয়ে বিশ্বজিৎ সূত্রধরের সাথে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি চেকটি অফিসে জমা দেননি।

 


এরপর গেল ৬ অক্টোবর কাবিটা চলতি হিসাব (হিসাব নং: ৫৯১১৩০২০০০৬৪০)—এর সোনালী ব্যাংকের তাহিরপুর শাখা থেকে হিসাব বিবরনী উত্তোলনের পর দেখা যায় সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ কারণে কাবিটা প্রকল্পের চলতি হিসাবের হিসাব বিবরণীর সাথে বিল রেজিস্টারের বৈষম্য দেখা দিয়েছে। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান ওই প্রকৌশলী।

 


স্থানীয়ভাবে খেঁাজ নিয়ে জানা গেছে, ওই চেকটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তাহিরপুর উপজেলা অফিসের কার্যসহকারী জিলানী মিয়ার নামে থাকলেও তিনি চেকটির টাকা উত্তোলন করেননি। ইএনও’র অফিস সহকারী কাম—কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বিশ্বজিৎ সূত্রধরের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হলেও ব্যাংক থেকে টাকাগুলো উত্তোলন করেছেন ইউএনও’র কার্যালয়ের উদ্যোক্তা এনায়েত পাটোয়ারী। 

 


সোনালী ব্যাংক তাহিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক অর্পন যেত্রা বলেন, বেয়ারার চেকের টাকা যে কোন ব্যক্তি ব্যাংকে নিয়ে আসলে উত্তোলন করতে পারেন। এছাড়া পরিচিতজনরা আসলে আমরা বেয়ারার চেকের টাকা দিয়ে দেই। ইউএনও অফিসের স্টাফ এনায়েত পাটোয়ারী এই চেকের টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। তিনি ইউএনও অফিসের স্টাফ, এই পরিচয়েই আমরা টাকা দিয়েছি।

 


এনায়েত পাটোয়ারি’র এই অনিয়মের খেঁাজ নিতে গিয়ে তাহিরপুরের একজন গণমাধ্যম কর্মীর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, গেল আট বছরে তাহিরপুর ইউএনও অফিসকে ঘুষের কারখানায় পরিণত করেছে এই ছেলে। দুর্নীতিবাজ সকল অফিসারের ঘুষ আদায়ের মধ্যস্ততাকারী থাকে সে। সালমা পারভিন নামের সাবেক একজন ইউএনও’র ভাইয়ের ড্রেজার মেশিন যাদুকাটায় চালাতো সে। ইজারাদাররা এই ড্রেজার মেশিনে তোলা বালুর রয়েলিটিও নিতো না। এটা সবাই জানে। এনায়েত এখন অনেক বিত্ত বৈভবের মালিক। তাহিরপুর বাজারে দোকান, দুটি হাউস বোট ও সুনামগঞ্জ শহরে বাড়ি সবই আছে তার।

 


ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাতের বিষয়ে এনায়েত পাটোয়ারি বললেন, ‘আমার নামে কোন অভিযোগ হয় নি। অথচ সংবাদ হচ্ছে আমার নামোল্লেখ করে, এটা কেন হচ্ছে প্রশ্ন করে— সে নিজেই বললো পাউবো’র ওই ইঞ্জিনিয়ার এখান থেকে চলে যেতে চায়—এজন্য সে আমার নাম ব্যবহার করে ঝামেলা বাধাতে চায়। এনায়েত বললেন— দোকান, বাড়ি, হাউস বোটের মালিক এগুলো অপপ্রচার। কেউ প্রমাণ করতে পারলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।

 


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম—কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বিশ্বজিৎ সূত্রধর অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের কাজের চেকের বিষয়ে উপ—সহকারী প্রকৌশলী ভাল জানেন। অন্যের নামের চেকের টাকা আমার তোলার সুযোগ নেই। অভিযোগ হয়েছে এখন ইউএনও স্যার তদন্ত করবেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তাহিরপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা কর্মকর্তা (এসও) উপ—সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন বলেছেন, সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার জানিয়েছেন এই চেকের টাকা ইউএনও’র অফিসের কর্মচারী এনায়েত পাটোয়ারী উত্তোলন করেছেন। ইউএনও স্যারের সাথে কথা হয়েছে আমি তাহিরপুরে গিয়ে উনার সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত জানাবো। ’

 

 


তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী বলেন, আমি কয়েকদিন হয় যোগদান করেছি। টাকা উত্তোলনের ঘটনা আমি যোগদানের আগের। ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ—সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন একটি অভিযোগ দিয়েছেন। যেহেতু লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, বিষয়টির তদন্ত চলছে। তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য উপজেলা সমবায় অফিসারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এনায়েত পাটোয়ারির নাম অভিযোগে উল্লেখ ছিল না। এখন যেহেতু বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে তার নাম ওঠে এসেছে। তদন্ত কমিটি নিশ্চয়ই তার সঙ্গে কথা বলবে। আমিও কথা বলবো।
তাহিরপুরের সাবেক (বর্তমানে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের উপজেলা) নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজের চেক পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ—সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেনের কাছেই থাকে, তিনি বলতে পারবেন চেকের টাকা কে উত্তোলন করেছে। যেহেতু বদলী হয়ে এসেছি তাই এখন বিস্তারিত বলতে পারব না। এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ হয়ে থাকলে বর্তমান ইউএনও বিষয়টির তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার