প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২৮
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার মিছাখালি রাবারড্যামের নীচ দিয়ে অবাধে বালু ও পাথরবাহী নৌযান চলাচল করার কারণে রাবারড্যামের প্লাস্টিক ড্যাম ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নৌপথের দূরত্ব কমাতে জাদুকাটা থেকে বালু ও পাথর বোঝাই নৌযান নির্দিষ্ট রুটের পরিবর্তে এই রাবারড্যামের নীচ দিয়ে চলাচল করে। এই জায়গা দিয়ে নৌযান চলাচল না করার জন্য রাবারড্যামের নীচে লোহার ব্যারিকেড দেয়া হলেও সেগুলো ভেঙেই নৌকা চলাচল করে। স্থানীয়ভাবে অথবা বিএডিসি’র পক্ষ থেকে এই অবৈধ নৌ—চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে এই রাবারড্যামের আওতাধীন হাওরের কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। পাহাড়ি ঢল ও আকষ্মিক বন্যার পানি যাতে আঙ্গারুলি ও পুটিয়ার হাওরে ঢুকতে না পারে সে জন্য এক দশক আগে এই বৃহৎ রাবারড্যামটি তৈরি করেছিলো বিএডিসি। এটিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রাবারড্যাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাবারড্যাম রক্ষণাবেক্ষণ, দেখভাল ও তদারকির জন্য ড্যামের আওতাধীন কৃষকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি পরিচালনা কমিটি আছে।
এই কমিটির দায়িত্ব হলো— ড্যামের প্রতি সার্বক্ষণিক নজর রাখা এবং প্রয়োজনীয় মেরামত ও সংস্কারের জন্য বিএডিসি’র সাথে সমন্বয় রক্ষা করা। কিন্তু নৌ চলাচলের কারণে যে রাবারড্যামটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝঁুকির মধ্যে পড়েছে তা রোধ করতে এই কমিটি স্পষ্টতই ব্যর্থ হচ্ছে বলে বুঝা যাচ্ছে। বিএডিসি’র পক্ষ থেকে সুনামগঞ্জের খবরকে বলা হয়— ‘প্রকল্প থেকে সুবিধা ভোগ করলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির আগ্রহ নেই। স্কিমের সুফল নেয়া হলেও দায়িত্ব পালনে কমিটি উদাসীন’। এই অভিযোগের বিপরীতে পরিচালনা কমিটির দাবি— ‘বিএডিসি এই বিষয়ে কোনো তদারকি করছে না’। অর্থাৎ অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ করে যে যাঁর দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করছেন। বিষয়টি হতাশাজনক। এ কথা সত্য, রাবারড্যাম পরিচালনা কমিটির সদস্যগণসহ প্রকল্পের সুফলভোগীরা সচেতন ও তৎপর না হলে অবৈধ নৌ চলাচল বন্ধ করা কখনও সম্ভব নয়। পরিচালনা কমিটিকে এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। রাবারড্যাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে যে তাঁদের জমিই হুমকির মুখে পড়বে এই বিষয়টি বিবেচনা করে রাবারড্যামকে যাবতীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা তাঁদের দায়িত্ব। অন্যদিকে বিএডিসিকেও দায়িত্ব নিতে হবে। এই রাবারড্যামের নীচ দিয়ে নৌ—চলাচলের কারণে ক্ষয়—ক্ষতি ও ঝঁুকির বিষয় উল্লেখ করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ তাঁদের দায়িত্ব। বিএডিসি ও পরিচালনা কমিটি সমন্বিতভাবে যার যার দায়িত্ব পালন করলেই রাবারড্যামটি নিরাপদ থাকবে।
রাবারড্যাম একটি সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাবার ব্যাগ ফেটে গিয়ে পানি আটকানোর ক্ষমতা হারাতে পারে। রাবারড্যামের দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিতের জন্য নিয়মিত পাংচার বা লিক পরীক্ষা, আবর্জনা অপসারণ, কাদা পরিষ্কার, অবৈধ নৌ—চলাচল বন্ধ করা, এয়ার ব্লয়ার বা পাম্প পরীক্ষা করা দরকার। নজরদারির অভাবে বহু টাকা ব্যয় করে নির্মিত রাবারড্যাম কার্যকারিতা হারাতে পারে। তখন এলাকার একটি বড় অংশের কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশ্ঙ্কায় পতিত হবে। সংবাদ তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, এর আগেও ড্যামের রাবার ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। তাই এখন অধিকতর সতর্কতা প্রয়োজন। এই ড্যামের নীচ দিয়ে নৌ—চলাচল বন্ধ করতে বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসনের শক্ত ভূমিকা কাম্য। কেবল সচেতনতা সভা বা মাইকিং করে কাজ হবে না। অবৈধভাবে চলাচলকারী নৌযান আটক করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে এখানে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে বিএডিসি ও পরিচালনা কমিটিকে প্রশাসনের সাথে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন করতে হবে।
এই ড্যামের আওতায় প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়। প্রতি একর জমির জন্য ৫০ টাকা করে কৃষকদের নিকট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ আদায় করা হয়। গত মৌসুমে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই টাকা নেয়া হয়নি। এর আগে পর্যন্ত আদায় করা টাকার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন বিএডিসি’র একজন উপসহকারি প্রকৌশলী (সেচ)। এই অভিযোগও গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা জরুরি। মনে রাখতে হবে সুফলভোগী কৃষক, বিএডিসি ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর সমন্বয় ব্যতীত প্রত্যাশিত পরিবেশ আনয়ন করা সম্ভব নয়। তাই সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল, আন্তরিক ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এই রাবারড্যামটি স্থানীয় অন্তর্কোন্দলের কারণে নষ্ট হোক, কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে কখনও তা কাম্য নয়।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন