মুক্তমত

হাছন রজা, কবীর ও রবীন্দ্রনাথ এক মরমী গানের সূত্র ধরে

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৫৭

অন্তরের পরমসত্তার সন্ধানে:

কয়েক বছর আগে বাংলা সারেগামাপা অনুষ্ঠানে আমাদের শিলচরের কৃতী সন্তান, বিশিষ্ট লোকসংগীতশিল্পী ও ‘দোহার’-এর প্রতিষ্ঠাতা কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের কণ্ঠে একটি গান শুনে গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছিলাম। গানটি সিলেটের মরমী কবি হাছন রজার—

“আমি হইতে আল্লাহ্ রসুল, আমি হইতে সব...”

কালিকাপ্রসাদের পরিচালনায় দোহার গানটি গেয়েছিল। কিন্তু গানটির চেয়েও আমাকে আকৃষ্ট করেছিল তাঁর একটি মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত Hibbert Lectures-এ হাছন রজার মরমী দর্শনের উল্লেখ করেছিলেন।

এই তথ্যটি আমার কাছে ছিল সম্পূর্ণ নতুন। কৌতূহলবশত সংগ্রহ করলাম রবীন্দ্রনাথের The Religion of Man গ্রন্থটি। পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, বাংলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোককবি কী গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে সহজ গানের ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, যা বিশ্বকবির দার্শনিক আলোচনাতেও বিশেষ স্থান পেয়েছে।

পরবর্তীকালে কমল চৌধুরীর সংগ্রহ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত সিলেটের ইতিহাস গ্রন্থে প্রভাতকুমার শর্মার ‘মরমী কবি হাছন রজা’ প্রবন্ধটি পড়ে এই বিষয়ে আমার আগ্রহ আরও গভীর হয়। প্রবন্ধটি মূলত ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যার ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

হাছন রজার ‘আমি’—কোন আমি?

হাছন রজার গানে বারবার ফিরে আসে ‘আমি’ এবং ‘তুমি’র সম্পর্ক। কিন্তু এই ‘আমি’ কি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সীমাবদ্ধ অহংবোধ?

তাঁর আরেকটি গানে পাওয়া যায়—

“রূপ দেখিলাম রে নয়নে,
আপনার রূপ দেখিলাম রে।
আমার মাঝত বাহির হইয়া
দেখা দিল আমারে।”

কী আশ্চর্য উপলব্ধি!

যাঁকে এতদিন নিজের বাইরে খুঁজছিলেন, তিনি যেন নিজের অন্তর থেকেই প্রকাশিত হলেন। দর্শক এবং দৃশ্য, উপাসক এবং উপাস্য—এই বিভেদের সীমারেখা যেন মুছে যেতে শুরু করল।

হাছন রজার আরেকটি গানে আছে—

“আমি ঘরে আমি বাইরে, আমি যে সর্ব ঠাঁই,
আমি বিনে আর কিছু দেখিতে না পাই।”

এই ‘আমি’কে যদি ব্যক্তিগত অহংকার বলে ধরা হয়, তবে গানের অর্থই হারিয়ে যায়। বরং এখানে এমন এক সর্বব্যাপী সত্তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যিনি ব্যক্তিমানুষের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র অস্তিত্বে বিরাজমান।

উপনিষদের অদ্বৈততত্ত্ব

হাছন রজার এই মরমী উপলব্ধির সঙ্গে অদ্বৈত বেদান্তের গভীর ভাবগত সাদৃশ্য রয়েছে।

ছান্দোগ্য উপনিষদের মহাবাক্য—

“তত্ত্বমসি”—তুমিই সেই।

মাণ্ডূক্য উপনিষদ ঘোষণা করেছে—

“অয়মাত্মা ব্রহ্ম”—এই আত্মাই ব্রহ্ম।

আর বৃহদারণ্যক উপনিষদ বলেছে—

“অহং ব্রহ্মাস্মি”—আমিই ব্রহ্ম।

এই ‘আমি’ দেহ, মন বা অহংকারের পরিচয় নয়। অদ্বৈত বেদান্তে এটি শুদ্ধ চৈতন্যের নির্দেশক—যে চৈতন্য আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতার সাক্ষী।

অদ্বৈত দর্শনের মূল কথা, জীবের প্রকৃত আত্মস্বরূপ এবং পরম সত্য ব্রহ্ম অভিন্ন। অবিদ্যার কারণে আমরা নিজেদের পৃথক ও সীমাবদ্ধ সত্তা বলে মনে করি।

হাছন রজার গানেও যেন সেই ভেদবোধ অতিক্রম করার বোধ ধ্বনিত হয়। তবে তাঁর উপলব্ধির প্রকাশ শাস্ত্রীয় যুক্তির ভাষায় নয়, প্রেম ও মরমী অভিজ্ঞতার ভাষায়।

কবীরের বাণীতে একই অন্তর্মুখী অনুসন্ধান

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে পঞ্চদশ শতকের সন্তকবি কবীরের বিখ্যাত পদ—

“मोको कहाँ ढूँढ़े बंदे,
मैं तो तेरे पास में।”

অর্থাৎ, হে মানুষ, তুমি আমাকে কোথায় খুঁজছ? আমি তো তোমারই কাছে!

কবীর আরও বলেছেন—

“ना मैं देवल ना मैं मसजिद,
ना काबे कैलास में।”

অর্থাৎ, আমাকে কেবল মন্দিরে, মসজিদে, কাবায় কিংবা কৈলাসে খুঁজে পাবে না।

কবীরের বক্তব্য বাহ্যিক উপাসনার বিরোধিতা নয়; তিনি আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিচ্ছেন অন্তরের দিকে। যে পরমসত্তাকে আমরা দূরে খুঁজি, তিনি আমাদের অস্তিত্বের অন্তরতম সত্য।

হাছন রজার সুফি-প্রভাবিত মরমী সাধনা, কবীরের নিরাকারের ভক্তি এবং উপনিষদের অদ্বৈত দর্শন—তিনটি স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক ধারা। তবু অন্তরের পরমসত্তার সন্ধানে তাদের মধ্যে এক গভীর সুরের মিল রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের হিবার্ট বক্তৃতায় হাছন রজা

১৯৩০ সালের মে মাসে রবীন্দ্রনাথ অক্সফোর্ডের Manchester College-এ Hibbert Lectures প্রদান করেন। এই বক্তৃতাগুলির ভিত্তিতে, পরবর্তী সংযোজনসহ, ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Religion of Man।

গ্রন্থটির সপ্তম অধ্যায়, The Man of My Heart-এ রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের এক গ্রাম্য কবির গান উল্লেখ করে ব্যক্তিমানুষ ও বিশ্বসত্তার সম্পর্ক আলোচনা করেছেন। সেই কবি হাছন রজা।

এরও আগে, ১৯২৫ সালে Indian Philosophical Congress-এর সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ হাছন রজার মরমী দর্শনের উল্লেখ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের কাছে এই লোককবির গুরুত্ব ছিল তাঁর সহজ ভাষায় প্রকাশিত গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দর্শনের সত্য কেবল শাস্ত্রের পৃষ্ঠায় নয়, সাধারণ মানুষের জীবন ও সংগীতের মধ্যেও প্রকাশিত হতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের মানবধর্মে ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে বিশ্বমানবের সম্পর্ক, প্রেম এবং অন্তর্নিহিত অসীমের উপলব্ধি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। হাছন রজার গান সেই ভাবনার সঙ্গে এক আশ্চর্য সেতুবন্ধন রচনা করে।

বহুর মধ্যে একের উপলব্ধি

আজকের পৃথিবীতে ধর্ম, জাতি, ভাষা ও পরিচয়ের বিভেদ ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। অথচ আমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গভীরে রয়েছে ঐক্যের এক অনন্য বাণী।

হাছন রজা আল্লাহ, খোদা কিংবা বন্ধুর নামে যাঁকে ডেকেছেন, কবীর নির্গুণ রামের মধ্যে যাঁকে খুঁজেছেন, উপনিষদের ঋষিরা ব্রহ্ম বলে যাঁকে উপলব্ধি করেছেন—তাঁদের দার্শনিক ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ এক না হলেও সকলের সাধনায় সীমাবদ্ধ অহংবোধ অতিক্রম করার আহ্বান রয়েছে।

এই উপলব্ধি আমাদের শেখায়, মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে এমন এক গভীর আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা রয়েছে, যা পারস্পরিক প্রেম, সম্মান ও সহমর্মিতার ভিত্তি হতে পারে।

কালিকাপ্রসাদের কণ্ঠে শোনা সেই গান থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থ এবং প্রভাতকুমার শর্মার প্রবন্ধ—এই অনুসন্ধান আমাকে বারবার ফিরিয়ে এনেছে এক চিরন্তন প্রশ্নের কাছে:

যাঁকে আমরা বাইরে খুঁজে বেড়াই, তিনি কি আমাদের অন্তরেই নিত্য বিরাজমান নন?

হাছন রজা যেন তাঁর সহজ সিলেটি ভাষায় সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়ে গেছেন—

“আমার মাঝত বাহির হইয়া
দেখা দিল আমারে।”

---

তথ্যসূত্র

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, The Religion of Man, ১৯৩১; সপ্তম অধ্যায়, The Man of My Heart।

২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, The Philosophy of Our People, Indian Philosophical Congress-এর সভাপতির ভাষণ, ১৯২৫।

৩. প্রভাতকুমার শর্মা, ‘মরমী কবি হাছন রজা’, ভারতী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ; পরবর্তীকালে কমল চৌধুরী সংগৃহীত ও সম্পাদিত সিলেটের ইতিহাস-এ পুনর্মুদ্রিত বলে লেখকের উল্লেখ।

৪. কবীর, ‘মোকো কহাঁ ঢুঁঢ়ে বন্দে’, কবীর বাণী, আলি সরদার জাফরি সম্পাদিত।

৫. ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬.৮.৭; মাণ্ডূক্য উপনিষদ ২; বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১.৪.১০।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার