মুক্তমত

অস্থিরতার মূলে অনৈতিক অর্থলিপ্সা: সুনামগঞ্জের শুদ্ধি অভিযান কি পারবে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে?

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:৩০

সম্প্রতি চাঁদাবাজির ঘটনা প্রসঙ্গ

সম্প্রতি সুনামগঞ্জ—৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার পর বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি রাজনৈতিক মহলে বেশ ইতিবাচক আলোচনা তৈরি করেছে। দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই ধরণের কঠোর অবস্থান নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার আর দলের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লোটার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার বিপরীতে এমন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করে। তবে সচেতন নাগরিক হিসেবে শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় এই তৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং সুনামগঞ্জের বহু বছরের পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও অস্থিরতার মূলে হাত দিতে হবে। 

 


বাস্তবতা হলো, সুনামগঞ্জে এমন আরও বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল ইস্যু রয়েছে, যা বছরের পর বছর ধরে জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে সেই প্রতিবাদগুলো বরাবরই আঁধারে ঢাকা পড়ে গেছে।

 


উদাহরণস্বরূপ, যদুকাটা বালুমহালে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে দীর্ঘকাল ধরে। নদী আর পরিবেশ ধ্বংসের এই আয়োজন কোনো লুকোচুরি বিষয় নয়। একইভাবে, ইজারাহীন ধুপাজান পাথরমিশ্রিত বালুমহাল থেকে প্রতিদিন প্রকাশ্য দিবালোকে বালু ও পাথর চুরি করা হচ্ছে। এর ফলে সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অথচ একটি নির্দিষ্ট সুবিধাভোগী গোষ্ঠী রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠছে। ছাতকের চেলা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন কিংবা দোয়ারাবাজারের বগলাবাজার সীমান্ত দিয়ে অবাধে গরু চোরাচালানের মতো ঘটনাগুলো আজ ওপেন সিক্রেট।

 


এই যে সীমান্ত চোরাচালান আর নদী—মহাল লুটের মচ্ছব, এগুলো কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়াই এর জন্য দায়ী। সাধারণ মানুষের মনে আজ তীব্র প্রশ্ন—বিগত ফ্যাসিবাদের মূল হোতা বা প্রকৃত গডফাদারদের সাথে মিলেমিশে কারা এখনো এই অবৈধ ব্যবসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে? ক্ষমতার হাতবদল হলেও যদি লুটেরাদের হাতবদল না হয়, তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষ পাবে কীভাবে? জনগণ আজ দেখতে চায়, শুধু চাঁদাবাজির অভিযোগেই নয়, বরং এই বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, পরিবেশ ধ্বংস ও চোরাচালানের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক দলগুলো সমভাবে সোচ্চার হোক এবং মাঠে নেমে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করুক।

 


রাজনীতিতে এই অস্থিরতার মূল কারণ হলো রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার অনৈতিক মানসিকতা। কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীর হঠাৎ করে অনৈতিক উপায়ে অর্থনৈতিকভাবে ফুলে ফেঁপে ওঠা পুরো সমাজব্যবস্থাকে কলুষিত করছে। সৎ ও আদর্শিক কর্মীরা যখন কোণঠাসা হয়ে পড়ে, আর অর্থলোভী সিন্ডিকেট যখন দলের নীতি নির্ধারণ করতে শুরু করে, তখনই সমাজে ও রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা নেমে আসে।
সমাজ ও রাজনীতি থেকে এই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দূর করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আদর্শিক দৃঢ়তা। যারা মনেপ্রাণে স্বচ্ছতা ও সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন, কোনো অপশক্তি বা ষড়যন্ত্রই তাদের একবিন্দু ক্ষতি করতে পারে না। সাময়িক কোনো লাভ বা প্রভাব বিস্তারের চেয়ে নৈতিকতার শক্তিতে বলীয়ান হওয়াই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার একমাত্র উপায়।

 


সুনামগঞ্জের বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো যেভাবে দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি দেখাচ্ছে, তার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। নদী—পাথর মহালের সিন্ডিকেট ভাঙা, চোরাচালান রোধ এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদের মুখোশ উন্মোচন করার ক্ষেত্রেও এমন কঠোর ও দৃশ্যমান অবস্থান নিতে হবে। তবেই রাজনীতিতে জনগণের আস্থা ফিরবে এবং একটি সত্যিকারের বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার