রাজনীতি কি ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিজনেস মডেল’ হয়েই থাকবে ?

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:৩২

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাংলাদেশের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর এক নেতিবাচক প্রবণতা প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতাচর্চার সাথে জড়িত রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি সকলের জানা। এই জানা কথাগুলোই টিআইবি’র পদ্ধতিগত গবেষণায় আনুষ্ঠানিক ফলাফল হয়ে সকলের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। রবিবার রাজধানীতে টিআইবি ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনে ৩২টি রাজনৈতিক দলের তথ্য পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, দলগুলো আনুষ্ঠানিক আয়—ব্যয়ের যে হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দেয় তার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। গবেষণা প্রতিবেদন মতে একটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশনের শর্ত মোতাবেক ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলা কার্যালয় ও কার্যক্রম সচল রাখতে হয়, এ জন্য বছরে প্রায় ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা খরচের প্রয়োজন পড়ে। অথচ রাজনৈতিক দলের সাংগাঠনিক কাঠামো থেকে সদস্য চাঁদা বাবদ সর্বোচ্চ ২৬ লাখ টাকা আসে। প্রশ্ন হলো,  ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা খরচের বিপরীতে মাত্র ২৬ লাখ টাকা বৈধ আয়ের সংস্থান থাকলে অবশিষ্ট টাকা আসে কোত্থেকে। এই টাকার উৎস সবসময় রহস্যময় ও গোপন থাকে। যে—সব দলের সারা দেশের সকল ইউনিটে সাংগঠনিক বিস্তৃতি আছে সে—সব দলের বার্ষিক ন্যূনতম সাংগঠনিক খরচ দরকার ৩৩২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা, অথচ এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে সাংগঠনিক কাঠামো থেকে আয় আসে সর্বোচ্চ ৩৮ কোটি টাকা। আয়ের এই উৎস সংক্রান্ত রহস্যময়তার সাথে দলের ভিতর গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব, সদস্যদের আচরণ নীতিমালা না থাকা, শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য শাস্তির মাত্রা, অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আপিল প্রক্রিয়ায় বহু ঘাটতি আছে বলে টিআইবি’র গবেষণায় উঠে এসেছে।

 

গবেষণায় রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত সংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য উল্লেখ আছে। পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে— ৯ম থেকে ১৩তম এই পাঁচটি জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যের শতকরা হার যথাক্রমে ৫৬.৬%, ৫৭.৭%, ৬০.৩%, ৬৫.৩% ও ৫৯.৯%। দেখা যায় ৯ম থেকে ১২তম সংসদ পর্যন্ত ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যের শতকরা হার প্রতি বারই বেড়েছে। কেবল সর্বশেষ ২০২৪ সনের ১৩তম জাতীয় সংসদে এই হার আগের সংসদের তুলনায় শতকরা ৫.৪ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বাড়ার কারণ এখন আর কারও অজানা নয়। বরং ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিচর্চাই হয়ে উঠেছে বড় আরেক বাণিজ্য। এই দিকটিকে ইঙ্গিত করেই টিআইবি গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে— ‘বড় দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ানের কারণে অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ছে। ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখন এক ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে’ পরিণত হয়েছে’। 

 


২০২৪ সনের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর গণমুখী পরিবর্তন দেখা ছিলো সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা এখন হুছট খেয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর গণমুখী নীতি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক তৎপরতা ও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির বিকাশ এখন লক্ষণীয়। ফলে অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ার পাশাপাশি সহিংসতা ও খুনোখুনি বেড়েছে। টিআইবি জানিয়েছে, গত ১৩ বছর আট মাসে দেশে মোট চার হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছে। এই সময়ে ৭৪৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত ও ৪৬ হাজার ৩৫১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতার পিছনে আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই প্রধান। এখনও এই প্রবণতা সমানভাবে ক্রিয়াশীল। টিআইবি’র গবেষণা মতে তারা যে ৩২টি দলের তথ্য অনুসন্ধান করেছে তার ১৬টি দলেই নিয়মিত জাতীয় কাউন্সিল বা সম্মেলন হয় না। দেশের অন্তত ১০টি প্রধান দলের শীর্ষ পদ সরাসরি পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে নির্বাচিত হচ্ছে। এ কারণে দেশে নেতৃত্বের বিকাশ হচ্ছে না। পারিবারিক উত্তরাধিকারিত্বের এই প্রবণতা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত। এখনও নেতার ছেলে বা ভাই পরবর্তী নেতা হবেন, এমন মনোস্তাত্ত্বিক বাতাবরণ সারা দেশে তৈরি হয়ে আছে। এতে মেধাবী ও নিবেদিত লোকজনের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের পরিমাণ কমে গেছে। 

 


রাজনীতি চর্চার পিছনে সুনির্দিষ্ট আদর্শিক বোধ কাজ করে। নির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে জনগণের কল্যাণ সাধনই রাজনীতির মূল লক্ষ্য। কিন্তু এখনকার দৃর্বৃত্তায়িত রাজনীতি কেবল ক্ষমতা চর্চা ও অর্থ আহরণের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা বজায় থাকে রাজনৈতিক দলের শাসন ক্ষমতা পরিচালনার মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা যদি এমন হয় তাহলে দেশের সুশাসন, ন্যায্যতা, বৈষম্যহীনতা, বিকাশ ও উন্নয়ন কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। রাজনীতিকে নিজের আদর্শবাদী জায়গায় ফিরিয়ে আনা এই সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে হলে আদর্শিক দৃঢ়তার সাথে গণমুখী চিন্তা—চেতনার প্রসার জরুরি।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার