প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২০:৫৩
‘গ্রামীণ কৃষকছড়া’ বা গ্রাম বাংলার লোকছড়া যে যেভাবেই বলি না কেন, কথা প্রসঙ্গে ব্যবহার বা ফোড়ন—কাটা বাঙালির প্রায় চিরাচরিত অভ্যাস। এসব ফোড়ন—কাটা লোকমুখে বা মৌখিক ভাষ্যে প্রচলন থাকায়, উচ্চারণ তারতম্যের কারণে একই বিষয়ের নানা ধরনের পাঠান্তর হয়। ফলশ্রম্নতিতে আবহমানকাল ধরে লোকপরস্পরায় মুখে মুখে রচিত কিংবা চর্চিত এসব প্রচলিত লোকছড়া এখনো বহমান। গাঁও—গেরাম, হাওর—বাওরে ঘুরলে এমন শত সহ¯্র ‘গ্রামীণ কৃষকছড়া’ বা গ্রাম বাংলার লোকছড়ার প্রচলন কথায় কথায় ফুটে ওঠে। আর উৎসব, পার্বণ হলে তো———! আর বলা লাগে না। নামের ও আয়োজনের দিক দিয়ে এসব উৎসব বা পার্বণ পরষ্পর থেকে স্বতন্ত্র হলেও কিছু উৎসব বা পার্বণের পিছনে রয়েছে গ্রাচীন লোকগাথা আবার কিছু উৎসব চলে আসছে বহু যুগের বংশ পরম্পরায়। তেমনই ভাটির হাওরে একটি ভোলাভোলী সংক্রান্তি। এমন পার্বণ উপলক্ষে প্রয়াত কমরেড শ্রীকান্ত দাশের পুরনো ডায়েরির ছেঁড়া পাতায় চোখ পড়লো— কৃষকের পেরতকাতি, ভোলাসংক্রান্তির “গ্রামীণ কৃষকছড়া”।
ভোলা ছাড়, ভোলী ছাড়, বারমাইয়া পিছাইয়া ছাড়,
ভাত খাইয়া লরবর, পানি খাইয়া পেটভর।
আইল লক্ষ্মী দিলবর, ধানে চাউলে ঘরভর,
খাইয়া না খাইয়া ফুল, লাখ টাকার মূল।
.jpg)
বলা যেতে পারে ভোলাভোলী কৃষিভিত্তিক সমাজের লোক উৎসব। ভাটির দেশ সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে এর দৃশ্য চোখে পড়লেও এর বিস্তার যে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, বগুড়া এমনকি ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলেও যে বিস্তৃত রয়েছে তা বিভিন্ন লেখকের লেখা না পড়লে হয়তো জানা যেতো না। তাছাড়াও বহির্বিশ্বে পরিপূর্ণ ভাবগাম্ভীর্য না মিললেও হ্যালোইন নামক উৎসবের প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ; পাশ্চাত্যে পা না পড়লে হয়তো বুঝা যেতো না। হ্যালোইন প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা পালন করলেও উন্নত বিশ্বে এটি প্রায় সর্বজনীন উৎসব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। যা আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ম্যাক্সিকো, ফিলিপাইন সহ সৌদিআরবেও উদযাপিত হচ্ছে।
রোমানদের পামোনা, কেল্টিকদের স্যামহেইন উৎসব ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ম নিরপেক্ষ ও কমিউনিটি নির্ভর উৎসবে পরিণত আজকের হ্যালোইন। অক্টোবরের শেষদিন হ্যালোইন ডে আর বাংলায় কার্তিক মাসের শেষদিন ভোলাভোলী পালিত হয়ে আসছে। যদিও ভোলাভোলীর ব্যাপ্তি হ্যালোইনের মতো প্রসারিত হয়নি বরং সংকটাপন্নের মুখে।
হ্যালোইনের ইতিহাস ঘাটলে এর প্রচলন, উৎস, বিস্তার জানতে পারলেও একইভাবে ভোলাভোলি নিয়ে পুরোপুরি উৎস, প্রচল বিস্তারের ইতিহাস এখনো তেমন একটা চোখে পড়েনি; বিশেষ করে ভাটি বাংলায়। তবে হ্যালোইন প্রথা, প্রচলন,উদযাপন লক্ষ্য করলে বুঝা যায় ইংরেজি বর্ষের অক্টোবরের শেষ কিংবা নভেম্বরের প্রথমদিনকে লক্ষ্য করে অক্টোবরের শেষদিন যেমন ধার্য্য হয়েছে অপরদিকে ভোলাভোলি বাংলাবর্ষে বাংলাদেশে নতুন বর্ষপঞ্জীর প্রচলন ১৯৮৮ কিংবা ভারতবর্ষের মূল বর্ষপঞ্জিকে লক্ষ্য করে কার্তিকের শেষদিন ধার্য্য হয়েছে।
ভাটির দেশ বা হাওরাঞ্চল বর্ষায় প্রায় ছয়মাস তলিয়ে থাকে। বসতভিটা, গ্রাম, বাজার, শ্মশান, গুরুস্থান ছাড়া তেমন জায়গা বাকি থাকেনা তলিয়ে যাওয়ার। চারিদিকে বিরাট জলরাশি, নতুন কোন মুখকে, সাগর ভাবিয়ে তুলে। পরিবেশ পরিস্থিতি এমন হয় সাগর সম ভাবনার বাহিরে ভাবাও মুশকিল। বুঝা যায় বিশাল হাওরের জলরাশি দিগন্তে বিলীন হয়ে যায়। হাওরে এমন জলরাশির প্রভাব যখন নিস্তেজ হয়ে আসে, ভরা বর্ষার জল তখন সরতে থাকে। উঁচু কান্দা, জাঙ্গাল, পোতা ভাসতে থাকে। চোখের পলকে হাওর শুকাতে থাকে। কিষাণ—কিষানীর প্রাণ ‘আবাদকৃত জমি’র আইল (সীমানা) ভেসে ওঠে। নির্দিষ্ট ডুবা, বিল, ঝিল, নদী ছাড়া ছয়মাসের ডুবন্ত ও পলির উর্বরতায় সবুজ বনভূমি হয়ে গড়ে ওঠে। ভরা বর্ষায় যে জলরাশিতে হাওর টয়টম্বুর ছিল সেখানে হেমন্তে সবুজ তৃণে পরিপূর্ণ হয়েওঠে। হয়েওঠে সবুজ সজীবতায় দিগন্তে একাকার। হাওরের স্থায়িবাসী ছাড়া হঠাৎ নতুন কোন মুখকে বর্ষা আর হেমন্তের এমন তফাৎ ভাবিয়ে তুলবে। ডুবন্ত হাওর জেগে ওঠে সবুজ বনজীবন তথা ঘাসময় জীবনের তৃপ্ততায় ভরে ওঠে। ইপিলিপি, চাইল্ল্যা, বৌল্লা, দুর্বা সহ নানান ঘাস, হ্বিছাশাকে ভেসে ওঠা মাঠে—ঘাটে, রাখালরা গরু চড়ানোতে মেতে ওঠবে। কিষাণপ্রাণ জলজীবনের অভ্যস্ততা ছেড়ে কৃষিজীবনের মগ্নতায় একনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। যে হাওরে পাল উড়িয়ে (যদিও এখন তেমন চোখে পড়ে না) ঘুরিয়েছে সেখানে প্রকৃতির লীলাখেলায় জনজীবন কৃষিকর্মমুখী হয়ে ওঠে। লাঙ্গল, জোয়াল, কোদাল আর গরুকে সারথী করে কৃষিকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিক ভাবে হাওরে যাত্রা শুরু করে। আবার অনেক বছর ঐ সময়টাকে কর্মবিমূখ ঘরবৈঠকী মানুষ, শেষ বর্ষার ঘনঘন বৃষ্টি, অতি কাদামাটি, দিনের হ্রসতা, তাপমাত্রা নিম্নগামীতা, ভেসে ওঠা হাওরে নিশিত ঘনঘটা অন্ধকারে, ভৌতিক কল্পনায় প্রকৃতির এমন বৈরী পরিবেশ ‘পেরত কাতি’ হিসেবে কৃষককূলে পরিচিত লাভ করে। তাছাড়াও উনিশ শতকের বিশিষ্ট গবেষক—লেখক রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁর প্রবন্ধে স্পষ্টত বলেছেন— শবদেহ এক সময় বনে—জঙ্গলে পরিত্যক্ত হত। পরে নদীতে ফেলে দেওয়া হত (সূত্র— অলক সরকার প্রণীত শ্মশান, মিথ, পুরাণ, ইতিহাস; শ্মশান বিষয়ে বিশেষ আলোকপাত অনিল ঘোষ) কাজেই ভরা বর্ষায় ভাটির হাওর তার ব্যতিক্রম নয়।
ভোলাভোলীর আগপর্যন্ত ঐ সময়টাতে হাওরের পানি সরতে দেরি হলে মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না। পায়ের জুতো হাতে ওঠে। যাতায়াত না করা যায় নৌকায়, না পারা যায় হেঁটে। ঐসময়ে হাওরের জলে নিমজ্জিত, লোকারণ্যহীন পরিত্যক্ত পরিবেশে ভেসে ওঠা ঝোপঝাড়, বনজঙ্গল, ছনকিত্তা, কান্দায় যেন এক ভৌতিক পরিবেশ বিরাজ করে।
অপরদিকে হাওরে পানি শুকিয়ে উঠলে যোগাযোগের মাধ্যম ‘বর্ষার নাউ (নৌকা) বন্ধ হয়ে হেমন্তে পাউ (পা)’ পরিচিত হয়ে ওঠে। এক গ্রাম হতে আরেক গ্রামে, বাজার—হাঁটের যাতায়াতে নদী পারাপারে ‘গুদারা’ নামক খেয়ানৌকার চালু হয়ে থাকে। হেমন্তের ছয় মাস যা জৈষ্ঠ্যের করমাদি সংক্রান্তি পর্যন্ত; মোটের উপর আরেক বর্ষা আসা পর্যন্ত এমন প্রচলন পড়ে থাকে। বাজার কমিটির সিদ্ধান্তে বাজারের গুদারা আর গ্রামের দশ/পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্তে গ্রাম্য গুদারা এবং নিজ নিজ আত্মীয় সজনদের সম্মানে বিনা পয়সায় নদী পার করে দেয়ার ছয়মাসের ‘বন্ধনা’ (আবদ্ধ) হয়ে থাকে। বন্ধনা ছাড়া নদী পারাপারে পয়সা লাগলেও একেক মাসে, একেক গ্রামে, একেক প্রান্ত হতে ‘পরবী তোলা’ ব্যবস্থায় গুদারাঘাট পরিবারটি চলার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।
কাজেই ভোলাভোলি বা কার্তিক সংক্রান্তিকে ঘিরে গ্রাম্য—হাওর জনজীবন কম—বেশি ছয়মাসের জলাবদ্ধতা জীবন কাটিয়ে শুকনো—হেমন্তে রোগ—শোক মুক্ত কামনায় নতুন ফসল বুনন, বপন, সংগ্রহ, গৃহপালিত গবাদিপশুর মঙ্গল কামনায়, সকল জরাজীর্ণতা পোড়িয়ে শুভ প্রত্যাশায় এমন আনুষ্ঠানিকতাকে প্রাধান্য দিতে হয়তো ভোলাভোলি। আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষক হাওরে নামে, হাওরে গরু ছাড়ে, খেয়াঘাটে মাঝি বসে আবার গ্রামগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন লোক দেবতার অর্চনা করে থাকে।
হ্যালোইন বর্তমানে উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি বাণিজ্যিক। পাশ্চাত্যের বাণিজ্যিক বিপণনগুলোতে কেনাকাটায় খ্রীস্টমাস ডে’র মতোই ভীড় জমে ওঠে। চাহিদা বেড়ে যায় মিষ্টি কুমড়া সহ উৎসব সংক্রান্ত নানা অনুষঙ্গের। দেখাযায় কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে থাকে এ উৎসবকে কেন্দ্র করে। হ্যালোইনের সাজসজ্জায় ভয় আর আনন্দের সংশ্লেষণ ঘটে। শিশু—কিশোরদের নিষ্পাপ আমোদ যেন আমাদের দেশের ‘যেমন খুশি তেমন সাজ’। তারা ভৌতিক আলোয় যেমন— বেগুনি, কমলা ও সবুজ রঙের মিশ্রণে অনুজ্জ্বল (ডিম) আলোয় সজ্জিত করে। ভুতুড়ে অবয়ব/ প্রতীকী দৈত কল্পনায় মিষ্টি লাউর (কুমড়া) ভেতরের অংশ পরিষ্কার করে চোখ, মুখ, নাক বিকৃত আকৃতি বানিয়ে ভেতরে ছোট মোমবাতি বা লাইট জ্বালিয়ে রাখে (জ্যাক—ও—ল্যান্টার্ন)। ঘরের কোণে কিংবা গাছে কৃত্রিম কঙ্কাল, মাথার খুলি এবং তুলা বা সুতো দিয়ে তৈরি মাকড়সার জাল ঝুলিয়ে রাখে। বড়ো কালো কাগজ কেটে বাদুড় বানিয়ে দেওয়ালে বা ছাদে ঝুলিয়ে রাখে। তাছাড়াও ভূতুড়ে কাপড়চোপড়, মুখ বিচিত্র রঙে রাঙিয়ে আজগুবি চেহেরা, মাথায় লম্বা ছুঁচালো টুপি, মুখে বিকৃত গোঁফ, হাতে রূপকথার ডাইনিবুড়ির উড়ান বাহন ডাটিওয়ালা লম্বা ঝাড়ু নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠে।
খাবারের দিকথেকে সাধারণত ক্যান্ডি আপেল ও ক্যারামেল আপেল, ক্যান্ডি কর্ন, পাম্পকিন কেক/পাই, স্পাইডারওয়েব মাফিন ও ঘোস্ট কাপকেক, উয়িচেস ব্রু পাঞ্চ(পাণীয়), স্পাইডার ডেভিলড এগ, মাম্মি হট ডগ, পাম্পকিন স্যুপ, পাম্পকিন পাস্তা সহ হরেকরকম মজাদার, মিষ্টি এবং কিছুটা ভুতুড়ে বা থিমভিত্তিক খাবার খেয়া থাকে।
পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের গ্রাম—বাংলার হ্যালোইন বনাম ভোলাভোলী উৎসব উদযাপনে আলোক সজ্জা, আতশবাজি, বাণিজিকতা, জাঁকজমকতায় সামর্থের যথেষ্ট হেরফের লক্ষণীয় হলেও উভয়ের আদি/ গভীর ইতিহাস কাল্পনিক ভৌতিক ও অশুভ শক্তির। এক সময়ে ইউরোপের মানুষের জীবনব্যবস্থা ছিল অনেকটা কৃষিনির্ভর। তাদের ধারণা ছিল মৃত আত্মারা যেন ফসলের ক্ষতি করতে না পারে এবং আত্মার খারাপ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য বিভিন্ন রকমের মুখোশ, পশুর খুলি ও চামড়া দিয়ে ভুতুড়ে সাজসজ্জায় নিজেদের সজ্জিত করতো। এমনকি মৃত আত্মাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য নানা রকম খাদ্য ও ওয়াইন উপঢৌকন হিসেবে দরজার বাইরে রেখে দিতো।
অঞ্চল বিশেষে ভোলাভোলী উৎসব উদযাপনে
ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। বাঁশ, খড় ও পাটের দড়ি/সূতা দিয়ে তৈরি করা হয় ভোলাভোলীর প্রতিকৃতি। আবার অনেক সময় দড়ি/সূতার পরিবর্তে বাঁশের বেত, নারিকেল খোলের বেত, মুক্তার বেত এমনকি করচগাছের জরের (শিখর) ব্যবহার চোখে পড়ে। সাধারণত ভোলাভোলীর লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য ভোলার পেছনে লেজ ও সঙ্গে তাদের অপেক্ষাকৃত ছোট বাচ্চা সহ তিনটি প্রতিকৃতি বানানোর রেওয়াজ প্রচলিত। বড় বড় কৃষক পরিবারে বালবাচ্চা বেশি হলে অধিক সংখ্যক ভোলাভোলী বানিয়ে থাকে।
অপেক্ষাকৃত উঁচু লাঠির মাথায় ভোলা তারচেয়ে নিচু লাঠির মাথায় ভোলী এবং তারচেয়েও নিচু লাঠিতে ছোট বাচ্চা—ভোলাকে বসানো হয়। অনেক কিশোর—কিশোরীরা নিজে না বানাতে পাড়লে ঘরের বয়োবৃদ্ধ বা কাজ—কামালদের সহায়তা নিয়ে থাকে।
অতঃপর ভোলাভোলী ও তাদের বাচ্চার মাথায় মারা মশা, মাছি, মাকড়, পিঁপড়া গুঁজে দেয়া হয়। আরো গুঁজে দেয়াহয় খোলাপিঠার ছোট টুকরা। সংখ্যাতিক অনুপাত বেজোড় সংখ্যায় তিনটা, পাঁচটা এমনভাবে মশা—মাছি মারা হয়। এদেরকে ধরতে রান্নাঘর, বড়ঘর এমনকি গরুঘর, লাকাড়িঘর পর্যন্ত যেতে হয়। গ্রামজুড়ে মশামাছি মারায় কিশোর—কিশোরীরা মেতে ওঠে। শুরু হয় ভোলাভোলী উদযাপনের ধুম! এমনও হয়, স্থানীয় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটা/দুটো ক্লাস নিয়ে দিয়েদেয় ছুটি কিংবা ঐচ্ছিক ছুটিতে দিয়ে দেয় বন্ধ। সন্ধ্যার অপেক্ষায় ছেলে—মেয়েরা অস্থির। যেন ভোলাভোলী পুড়ার প্রতিযোগিতার পালা। বর্ষার জল সরে গিয়ে ভেসে ওঠা বিছড়ায় কূলা, রান্না করতে ফু দেওয়ার চুঙ্গা/শোয়া হাত লম্বা কলার ডাউক্কা,লোহার গুটনী, কাস্তে/ দা, ঘটি/লোটাতে কিছু পানি, আগুন ধরানোর জন্য বাতি, কেউ কূল—করতাল সহ যার যার ভোলাভোলী নিয়ে উপস্থিত হয়। সন্ধ্যায় একটু অন্ধকার হলেই ভোলাভোলীর মাথায় আগুন দিয়ে তৎসঙ্গে চুঙ্গা/কলার ডাউক্কা দিয়ে কূলাতে বাড়ি শুরু করে সবাই সমস্বরে কন্ঠ তুলে—
ভোলা ছাড়, ভোলী ছাড়, বারমাইয়া পিছাইয়া ছাড়,
ভাত খাইয়া লরবর, পানি খাইয়া পেটভর।
আইল লক্ষ্মী দিলবর, ধানে চাউলে ঘরভর,
খাইয়া না খাইয়া ফুল, লাখ টাকার মূল।
ভোলা পোড়া শেষ হলে, ঘটি/লোটার পানি দিয়ে ঠান্ডা করে, ভোলাতে ব্যবহৃত লাঠিগুলো ক্রসকরে কূলা দিয়ে ‘ভষ্মিভূত ছাই’কে ঢেকে রাখা হয়। মঙ্গল কামনায়, পরে এসব ছাই’কে সবজি বিছড়ায় (বাগান) ছিটিয়ে দেয়া হয়। এই পর্ব শেষ হলে একজন বয়োজেষ্ঠ নারী বা পুরুষ, একজন কিশোরকে সাথে নিয়ে ভাল ফলনের আশায় বাড়ির ফলবতীগাছগুলো কাটতে যায়। কিশোর দা/কাস্তে দিয়ে কাইট্টালাই কাইট্টালাই বললে আর বয়োজেষ্ঠ না না বলে সামনের বছর বেশি ফলন দিবে বুঝায়। যদিও প্রকৃত গাছকাটা নয় তবে এমন রীতির বিশ্বাস এখনো হাওরবাসীর মানসপটে বিরাজমান। দলে দলে কিশোর কিশোরীরা ছুটে এই বাড়ি হতে সেই বাড়ি। হাতে মুটিভরে ছোট ছোট কলার ডাউক্কা (ডাটা) নিয়ে বয়স, সম্পর্ক বিভেদ লক্ষ্য করে গ্রামীণ ছড়া “ভোলা ছাড়, ভোলী ছাড়— — —“ বলে একে অন্যের আশীর্বাদ বিনিময় করে। এবং বয়সে বড়ো হলে মান্য করে থাকে। একই ভাবে কিষাণ—কিষাণী তাদের গৃহপালিতপশুদের ভোলা ছাড়িয়ে থাকে ; এক্ষেত্রে কলার ডাউক্কাগুলোকে নদীর পানিতে ফেলে থাকে।
বিশেষ করে কিশোররা ভোলাভোলীর কয়েকদিন পূর্ব হতেই নিতে থাকে প্রস্তুতি। গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজে আমড়াফলের বিচি। ওরা আমড়াফলের বিচি, তার, নারিকেলের ঠালি, পুরনো বস্তা দিয়ে কয়েকদিন যাবৎ কেরোসিনে ভিজিয়ে বোমার মতো ‘মচা’ তৈরি করে। যা উন্নত বিশ্বের আতশবাজির ন্যায়, শব্দহীন ভাবে আকাশে উড়ায়। সন্ধ্যার ভোলাভোলী পোড়া শেষ হওয়ামাত্র, কিশোররা ছুটে বেড়ায় কেরোসিনের তৈরি বোমা হাতে খলা, গাঙের পাড়,ভেসে ওঠা মাঠ, সড়ক সহ বড় বড় কান্দায়। হাত ঘুরিয়ে বোমাগুলো আকাশে এমনভাবে উড়ায় যেন আকাশের উল্কাপিন্ড উড়াউড়ি করছে। অন্ধকার ঘনিয়ে দূরের হাওরের অন্য প্রান্ত হতে দেখলে মনেহয় ভূত—পেরতে বাতি উড়াচ্ছে। জানান দেয়া হয় ভেসে ওঠা হাওরে মানুষের পদার্পণ।
দিনটি উপলক্ষে হাওরের গ্রামগুলোতে বিশেষ খাবারের রীতি চোখে পড়ে। আতপ চালের তৈরি খোলা পিঠা, কিঞ্চিৎ নেশা মিশ্রিত ভাত (স্থানীয় ভাবে মদ নামে পরিচিত) আবার কোন কোন গ্রামে সংযম করে ভোজে নিরামিষ অন্ন। গ্রামের সর্বজনমিলে করে সন্ধ্যা ও মধ্যরাতে পিঠা—পুলি—পায়েস—মিষ্টান্নের আয়োজন। গ্রাম বিশেষ নানা লোক দেবতার অর্চনা, আর্লি মর্নিং, সন্ধ্যা ও মধ্য রাতে নগরকীর্তন দিয়ে রোগ—শোক হতে মুক্তি ও ভূত—পেরত হতে বাঁচতে গ্রামের দুই প্রান্তে লাল ও সাদা মিলিয়ে টাঙানো হয় নিশান, শুভ কামনার জন্য করা হয় গ্রাম বন্ধনা।
আজ কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র ডায়েরীর ছেড়া পাতা পড়ে ৭১—র মুক্তির সারথী, ভাটির পুত্র সাংবাদিক সালেহ চৌধুরীর কথা মনে পড়ছে। তিনি বলতেন প্রায় এরকম— সবার আগে মানুষ হতে হবে। তারপর ধর্ম, কর্ম সমাজ দেশ, দশ সব পাওয়া যাবে। আর গবেষক, লেখক তাজুল মোহাম্মদ তো স্পষ্টতই বলেন— ‘ রাষ্ট্র যখন মানুষ বানাতে না পারে, সেটা যে কোন উৎসব বা ধর্মীয়/ সামাজিক উৎসব হোক না কেন, সেটা হয়ে ওঠতে পারে না সর্বজনীন আর যদি রাষ্ট্র সেখানে নির্জীব প্রাণহীন হয়ে পড়ে তখন সর্বজনীন উৎসব দূরের কথা বরং অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকে ধাবিত হয়। সংস্কৃতি, উৎসব উৎকন্ঠায় ভোগে; হয়ে ওঠে সংকটাপন্ন’। বাংলার ভোলাভোলীও আজ তাই আর হ্যালোইন দিনতো দিন পাচ্ছে সর্বজনীনতা।
লেখক : সাংস্কৃতিক কর্মী, সেইন্ট ক্যালিক্সট, কানাডা
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন