প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২১:৪৩
হাছন রাজা -ছবি
সিলেট প্রাকৃতিক ভাবে যেমন বৈচিত্র্যময়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও তেমনি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তা আছে, যা বহুলাংশে প্রতিফলিত হয় এখানকার বিভিন্ন ধারার লোকসংগীতে।
সিলেটের লোকসংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্বের নাম হাছন রাজা (আসল নাম: দেওয়ান অহিদুর রেজা চৌধুরী)। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের একজন মরমী কবি ও বাউল শিল্পী। জন্ম ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার সিলেট সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী পরগনার তেঘরিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে। তাঁর পিতার নাম দেওয়ান আলী রেজা চৌধুরী এবং মা হুরমত জাহান বিবি। হাছন রাজার পিতা দেওয়ান আলী রেজা চৌধুরী ছিলেন একজন প্রভাবশালী জমিদার। হাছনের তরুণ বয়সেই তিনি পরলোকগমন করেন।
পিতার মৃত্যুর পর অল্প বয়সে হাছন রাজা বিশাল জমিদারির দায়িত্ব লাভ করেন এবং হয়তো এই কারণেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর এগোয়নি। যৌবনের শুরুতেই বিশাল সম্পত্তির অধিকারী হওয়াতে তিনি আর দশজন জমিদারের মতোই চরম বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে শুরু করেন। এই বিলাসী জীবনের ছাপ পাওয়া যায় তাঁর সেই সময়ে রচিত কিছু চটুল গানে যা তাঁর “হাছন বাহার” বইতে সংকলিত।
কিন্তু কিছুদিন পর এই বিলাসবহুল জীবনযাপনকে হাসন রাজা হঠাৎ করেই পুরোপুরি ত্যাগ করলেন। তাঁর বিষয় সম্পত্তি প্রজাদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে নিজের বিলাসবহুল বাড়ি ছেড়ে সুরমা নদীর তীরে একটি সাধারণ কুটির বানিয়ে থাকতে শুরু করলেন এবং এক বাউলের জীবন বেছে নিয়ে আরাধনা ও গান রচনায় মগ্ন হলেন। এই রূপান্তরের পর তিনি নিজেকে ‘হাছন উদাস’ বা ‘পাগলা হাছন’ বলে অভিহিত করতে শুরু করেন। হাছন রাজা মুখে মুখে গান রচনা করতেন এবং তাঁর সঙ্গী ভক্তরা তা লিখে রাখতেন। ১৯০৭ সালে তাঁর ২০৬টি গান নিয়ে বিখ্যাত সংকলন ‘হাছন উদাস’ প্রকাশিত হয়। এছাড়া ‘শৌখিন বাহার’ ও ‘হাছন বাহার’ নামে তাঁর আরও দুটি গানের সংকলন আছে।
হাছন রাজার গানের প্রধান বিষয় আত্মপরিচয়, দেহতত্ত্ব, ঈশ্বর—অন্বেষণ, প্রেম, বৈরাগ্য এবং জীবনের অনিত্যতা। তাঁর গানের মূল দর্শন সুফিবাদ, বৈষ্ণবধর্ম এবং বাউল তত্ত্বের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের দেহের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস। তিনি অত্যন্ত সহজ ভাষায় অথচ গভীর তাত্ত্বিক রূপকের সাহায্যে গান বাঁধতেন। যেমন তাঁর বিখ্যাত একটি গান:
“লোকে বলে বলে রে, ঘর বাড়ি ভালা না আমার। কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরই মাঝার...”। এই গানে তিনি নিজের নশ্বর শরীর এবং পার্থিব জীবনের অস্থায়ী রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন। আবার স্রষ্টার সাথে নিজের আত্মার মিলনকে ব্যক্ত করে তিনি লিখছেন: “আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ, আপনার মাঝে দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ ......”। হাছন রাজার গান সহজ ভাষায় রচিত হলেও ভাবের দিক থেকে অত্যন্ত গভীর। গ্রামীণ মানুষের পরিচিত শব্দ, প্রকৃতি, প্রেম ও দৈনন্দিন জীবনের উপমার মাধ্যমে তিনি জটিল আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে সহজ করে তুলতেন এবং এই জন্য তাঁর গান শিক্ষিত ও সাধারণ—উভয় শ্রেণির মানুষের কাছেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী হাছন রাজার জীবদ্দশায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর কোনদিন দেখা সাক্ষাৎ হয় নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজে বাংলার লোকসাহিত্য ও লোকসংগীতের প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট ছিলেন এবং হাছন রাজার গান ও দর্শন পরবর্তীকালে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। রবীন্দ্রনাথ হাছন রাজার গানের দার্শনিক গভীরতা দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে, বিশ্বমঞ্চে তিনি এই বাউল কবির দর্শন তুলে ধরেন। ১৯২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান ফিলোসফিক্যাল কংগ্রেস’ এর প্রথম অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ হাছন রাজার গানের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করেন। তিনি তাঁর ভাষণে বলেন, পূর্ববঙ্গের একজন গ্রাম্য কবির গানে দর্শনের একটি মস্ত বড়ো তত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে ব্যক্তিস্বরূপের সাথে বিশ্বসত্যের মিলন ঘটেছে। এই বিখ্যাত ভাষণটি পরবর্তীকালে The Philosophy of Our People শিরোনামে বিখ্যাত “মডার্ন রিভিউ” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Hibbert Lectures এ বক্তৃতা দেওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর The Religion of Man (মানুষের ধর্ম) শীর্ষক বক্তৃতায় আবারও হাছন রাজার দর্শনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি হাছন রাজার গান, “রূপ দেখিলাম রে নয়নে, আপনার রূপ দেখিলাম রে/ আমার মাঝেতে বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে”— এর উল্লেখ করে উপনিষদের দর্শনের সাথে তুলনা করেন। রবীন্দ্রনাথের এই আন্তর্জাতিক উপস্থাপনার ফলেই হাছন রাজার আঞ্চলিক গান বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদা লাভ করে। হাছন রাজার দর্শনের কেন্দ্রে আমরা দেখতে পাই ‘মনের মানুষ’ বা অন্তরের সেই পরম সত্তার সন্ধান। তাই তাঁর গানে ধর্মীয় বিভাজনের পরিবর্তে মানবিকতা ও সার্বজনীন প্রেমের সুর প্রবল।
বৈরাগ্য ধারণ করলেও হাছন রাজা সমাজবিমুখ ছিলেন না। তিনি অনাথ, দরিদ্র ও আর্তমানবতার সেবায় তাঁর বিপুল সম্পত্তি দান করেছিলেন। সিলেটে অনেক বিদ্যালয়, মসজিদ এবং মন্দির প্রতিষ্ঠাতেও তিনি আর্থিকভাবে সাহায্য করেন। এছাড়া জানা যায় যে ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর তিনি দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর ৬৮ বছর বয়সে এই মরমী কবি মৃত্যুবরণ করেন। সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীতে তাঁর মায়ের কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়, যা এখন ‘হাছন রাজার মাজার’ নামে পরিচিত। এছাড়া সিলেট শহরের জিন্দাবাজারে তাঁর স্মৃতিতে গড়ে উঠেছে ‘হাছন রাজা জাদুঘর’, যেখানে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং রচনার পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। হাছন রাজা শুধু একজন জমিদার বা গীতিকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন খাঁটি জীবনশিল্পী। বিত্তের মোহ ত্যাগ করে চিত্তের সন্ধানে বের হওয়া এই বাউল সম্রাট সিলেট তথা বাংলা লোকসংগীতকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছেন।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন