টিভিতে বিশ্বকাপ ফুটবল ১৯৮২-২০২৬

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬ ০৮:২২

পর্ব -৩২ বা শেষ পর্ব
১৯ জুলাই, ২০২৬ সাল। টরেন্টো কানাডা সময় বিকাল বেলা ৩ টায় ২০২৬ বিশ্বকাপ আসরের ফাইনাল বা শেষ ম্যাচ শুরু হবে। আর্জেন্টিনা vs স্পেন। স্থান - নিউইয়র্ক নিউজার্সি স্টেডিয়াম। আসন ক্ষমতা - ৮০, ৬৬৩ (আশি হাজার ছয়শত তেষট্টি)। এখানে রবিবার। উইকএন্ড ছুটির দিন। বাংলাদেশ সময় ২০ জুলাই ২০২৬ সাল সোমবার রাত ১ টায় শুরু হবে খেলা। সবাই রাত জেগে বসে আছেন। আর্জেন্টাইন মূল সমর্থক গুনে শেষ করা যাবে না। আজকে স্পেন সমর্থকের প্রচুর সমাগম ঘটবে। আর্জেন্টাইন ফুটবল চেতনার পক্ষে ও বিপক্ষে সবাই আজ খেলা দেখবেন। ব্রাজিলভক্তরা সবাই আজ স্পেন সাপোর্টার। এদিকে স্পেন, ফ্রান্সের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়াতে ফ্রান্স ভক্তরা আজ আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। আর সেরা দুই দলের ফুটবল শিল্প ও সৌন্দর্য দেখতে অগণিত দর্শক আজকের জন্য ফুটবলের নন্দনকানন টিভি পর্দার সামনে ইতিমধ্যে আসন গ্রহণ করেছেন। যারা সরাসরি স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখবেন তারা ভাগ্যবান। দু’ঘন্টা আগেই টিভিতে অনুষ্ঠান শুরু। মেসিদের বহনকারী নীল সাদা রং বাস যাচ্ছে স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে। ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন, আলোচনা, বিভিন্ন পারফরম্যান্স, মেসির ক্যারিশমা, লামিন ইয়ামালের রেকর্ড করা ইন্টারভিউ দেখানো চলছে। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে কিক অফ ০৩ টা বাজে ০৬ মিনিট সময়ে। শুরুতেই স্পেনের আগ্রাসী মূর্তি। ৫ মিনিটের মাথায় স্পেনের দুরন্ত আক্রমণ থেকে ইয়ামালের মারাত্মক শট সেভ করেন আর্জেন্টাইন গোল কিপার। পর মুহূর্তে আবার স্পেনের আক্রমণ ব্যর্থ হয়। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। আর্জেন্টিনাকে চেপে ধরেছে স্পেন। স্প্যানিশদের অসম্ভব ধরনের গতি, নিখুঁত পাস। বাতাসের আগে দৌড়াচ্ছে তারা। আর্জেন্টাইন প্লেয়ারদের পা থেকে বল কেড়ে নিচ্ছে স্প্যানিশ খেলোয়াড়রা। ডোনাল্ড ট্রাম্প হাস্যোজ্জ্বল মুখে ভিআইপি আসনে বসে খেলা দেখছেন। তিনি কোন দলের সাপোর্টার তা বুঝার কোন উপায় নেই। আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট নিজেকে কুফা ভাবেন। তাই মাঠে খেলা দেখতে আসেননি। খেলার সময় যত গড়াচ্ছে স্পেনের আক্রমণ তত বাড়ছে। একচেটিয়া আক্রমণে স্পেন। তাদের প্রচন্ড গতি ও ছক কাটা পাসের খেলায় ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। তারা অনেকটা নাকানি চুবানি খাচ্ছে স্পেনের হাতে। স্পেনের লাল জার্সি, কালো প্যান্ট মনে হয় বাড়তি অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে প্লেয়ারদের মাঝে। আর্জেন্টাইন প্লেয়াররা খেই হারিয়ে ফেলছেন। খেলা চলে গেছে স্পেনের হাতের মুঠোয়। তবে দুইদলে প্রচুর পরিমাণ ফাউল হয়ে খেলার সৌন্দর্যের হানি ঘটছে। স্পেন একের পর এক আক্রমণ করলেও গোল করতে ব্যর্থ। খেলার ধারা অনুযায়ী এতক্ষণে স্পেন দু গোল পাওয়ার কথা। ৩৯ মিনিটের সময়ে আর্জেন্টাইন কিপার আরেকটি দুর্দান্ত সেভ করেন। ৪১ মিনিটের মাথায় আর্জেন্টাইন জার্সি নং ৬ মারাত্মক ফাউল করে হলুদ কার্ড পান। ৪৩ মিনিটের সময় স্পেন জার্সি নং ২৪ কুকুরেলার শট মিস আর্জেন্টাইন পোস্টে। কুকুরেলার লম্বা চুল দোলা খাচ্ছে বাতাসে। হাফ টাইম পর্যন্ত খেলায় আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছে নাস্তানাবুদ ও ব্যর্থ। টার্গেটে একটি শটও নিতে পারেনি আর্জেন্টাইনরা। মেসিকে ফাউল করে জব্দ রাখা হয়েছে। লামিন ইয়ামালের আক্রমণাত্মক গতিও ফাউল করে আটকে দেয়া হয়েছে একাধিকবার। হাফ টাইমের পর খেলা শুরু হলো আবার। একই অবস্থা আর্জেন্টিনার। তারা নড়তে চড়তে পারছে না। ওজন বেড়ে গেছে যেন। ৪৬ মিনিটের সময় স্পেন শট সেভ করেন আর্জেন্টাইন কিপার। ৫৫ তম ও ৫৬ তম মিনিটে পরপর দুটি স্পেন আক্রমণ ব্যর্থ। ৪৮ তম মিনিটে মেসির কর্নার কিক কাজে লাগেনি। ৬৭ তম মিনিটের সময় ইয়ামালের দুর্দান্ত শট থেকে ৭ নং হেডারের বল দুর্দান্ত সেভ করেন আর্জেন্টাইন কিপার। এদিকে ফাউল হচ্ছে একের পর এক। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রেফারি কিছু কিছু ফাউল সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ মনে হতে পারে। ৮১ তম মিনিটের সময় আবার আর্জেন্টাইন কিপারের সেভ। স্পেনের এত গতি আগে কোন খেলায় দেখা যায়নি। আর্জেন্টিনা এত শক্ত দলের পাল্লায় আগে কখনো পড়েনি। ৮৭ মিনিটের সময়ে আবার শট মিস করেন স্পেন জার্সি নং ৭। ৮৯ তম মিনিটে আবার মিস স্পেন স্ট্রাইকারের। বল চলে যায় বারের উপর দিয়ে। ৯০+ ২ মিনিটের মাথায় আর্জেন্টিনা প্রথমবারের মতো স্পেন পোস্টে শট নিলে তা ব্যর্থ হয়। এর এক মিনিট পর আর্জেন্টাইন কিপার পুনরায় সেভ করেন। এর পরেই আর্জেন্টাইন জার্সি নং ২৪ এঞ্জো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ত্যাগ করেন। দশজন টিমের সুবিধা পেতে পারে স্পেন। ৯০+ ০৪ মিনিট সময়ে স্পেন ইয়ামালের দূরপাল্লার বাতাসে বাঁক খাওয়া রংধনু ফ্রি কিক শট দুর্দান্ত সেভ করেন আর্জেন্টাইন গোল কিপার। আর কত সেভ করবেন তিনি। ৯০ মিনিটে সময়ে গোল না হওয়ায় খেলা চলে যায় অতিরিক্ত সময়ে।


৯৩ তম মিনিটে স্পেন হেডারের মারাত্মক হেড সেভ করেন আর্জেন্টাইন কিপার। ৯৬ মিনিটের সময় স্পেন ১৭ নং জার্সির গোল বাতিল হয়ে যায় আক্রমণের উৎসমুখে আগেই ফাউলের কারণে। ১০৪ মিনিটের সময়ে আবার স্পেন শট মিস। অবশেষে ১০৬ তম মিনিটের সময় গোল খরা কেটে তপ্ত মাঠে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল। স্প্যানিশ গোল। স্পেনের জোটবদ্ধ আক্রমণ থেকে তাদের জার্সি নং ৭, ফেরান টোরেস (Ferran Torres) বক্সের ভেতর থেকে বিদ্যুৎ চমকানো শটে গোল করলেন। আর্জেন্টাইন গোলকিপারের কিছুই করার ছিল না। ফেরান টোরেস আজকের গোল্ডেন বয়। পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টিনা মরিয়া হয়ে কয়েকবার চেষ্টা করেছে গোল পরিশোধ করতে। কিন্তু ব্যর্থ। ১২০ তম মিনিটের সময় মেসির শেষ চেষ্টার প্রচন্ড শট রুখে দেয় স্পেন ডিফেন্ডার ফোরহেড বা কপাল দিয়ে। খেলা শেষ। স্পেন যোগ্যতর দল হিসাবে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে পরাজিত করে ২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন শিরোপা জিতল। আজকের ফাইনাল খেলা হয়েছে স্পেন vs মার্টিনেজ, আর্জেন্টাইন গোল কিপারের মধ্যে। আর্জেন্টিনা আজকে সম্পূর্ণ ভাবে পরাস্ত এবং বিধ্বস্ত। They Lost the battle before starting of it. এমন বাজে খেলা তারা আগে খেলেননি। মেসি তার সুনাম অনুযায়ী আদৌ কিছু খেলতে ব্যর্থ হয়েছেন। অভিনন্দন স্পেন। রানার্স আপ আর্জেন্টিনাকেও অভিনন্দন, ফাইনাল পর্যন্ত আসরের উত্তেজনা টেনে রাখার জন্য। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপস্থিত আছেন। এতবড় আসরের অন্যতম প্রধান আয়োজক ইউএসএ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিনন্দন।


ফ্ল্যাশব্যাক - ষাটের দশকে সুনামগঞ্জের এ টিম লিগে মাইজবাড়ি গ্রামের ফুটবল টিম খুব শক্তিশালী ছিল। তাদের খেলার দিন গ্রাম ভেঙ্গে লোকজন হাজির থাকতেন। মাইজবাড়ি টিমের আস্বাব বা আশরাফ আলী ভাই দুর্দান্ত প্লেয়ার ছিলেন। নদীর ওপারের ইব্রাহিমপুর গ্রামের তজম ভাই দক্ষ ফুটবলার ছিলেন। আজাদীর হয়ে খেলতেন। বৃষ্টির দিনে কর্দমাক্ত মাঠে তজম ভাইকে কেউ আটকাতে পারতনা। তেমনি উত্তর আরপিননগরের আশ্বাব আলী আজাদীর শক্ত ব্যাকি বা ডিফেন্ডার ছিলেন। লাইন্সম্যান হিসাবে বিখ্যাত ছিলেন আরপিন নগরের ইল্লাস ভাই।


উপসংহার - আজকের এই পর্ব দিয়ে আমার লেখা শেষ হলো। আমার এই ধারাবাহিক লেখা প্রকাশ করার জন্য সুনামগঞ্জের সর্বাধিক প্রচারিত ও পাঠক নন্দিত " দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর " পত্রিকা পরিবারকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। পত্রিকা সম্পাদক পংকজ দে, উনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই আমাকে সুযোগ করে দেয়ার জন্য এবং মাঝেমাঝে জট লাগলে মুহূর্তে সমাধান করে দেয়ার জন্য। পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক ও ডেস্ক কর্মকর্তা সজীব নন্দন দেব, উনার কাছে কৃতজ্ঞ আমি। ১৫ হাজার মাইল দূর থেকে দিনরাত্রির ব্যবধানে সজীব যেভাবে সমন্বয় করে লেখা প্রকাশ করেছেন তার তুলনা হয় না। পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক সৌরভ ভূষন দেব আমাকে সাহায্য করেছেন। উনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। পত্রিকার কর্মী সুজয় দেব লেখা ছাপাতে সাহায্য করেছেন। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। বিজ্ঞ পাঠকেরা যারা আমার লেখা পড়েছেন ও পছন্দ করেছেন তাদের প্রতি ভালোবাসা রইলো। লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম এবারের আসরে গোল বন্যা হবে। ট্রিপল সেঞ্চুরি হতে পারে। ঠিক তাই ঘটেছে। এবারের আসরের মোট গোল সংখ্যা ৩০৮ টি (তিনশত আট)। মোট ১০ (দশ) গোল ও ৪ (চার) টি অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বুট পেয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। স্পেনের একমাত্র গোলদাতা ফেরান টোরেস ম্যান অফ দি ম্যাচ নির্বাচিত হয়েছেন। স্পেনের ক্যাপ্টেন রদ্রি বেষ্ট প্লেয়ার অফ দি টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হয়ে গোল্ডেন বল পেয়েছেন। স্পেন গোলকিপার উনাই সিমন সেরা গোলকিপার নির্বাচিত হয়ে গোল্ডেন গ্লাভস পেয়েছেন। মেসি সেকেন্ড বেষ্ট প্লেয়ার হিসাবে সিলভার বল ও সেকেন্ড বেষ্ট স্কোরার হিসাবে সিলভার বুট লাভ করেছেন। ১১ জুন থেকে ১৯ শে জুলাই পর্যন্ত মোট ম্যাচ হয়েছে ১০৪ টি। ফাইনাল খেলায় দীর্ঘক্ষন স্পেন গোল করতে না পারা এটা তাদের ব্যর্থতা। আর্জেন্টাইন অথর্ব খেলা তাদেরকে ম্লান করেছে। ভক্ত সমর্থকেরা আর্জেন্টিনা থেকে এই ধরনের খেলা আশা করেননি। দর্শকদের নিরাশ করেছে আর্জেন্টিনা। খেলার সৌন্দর্য হানি ঘটেছে মোট ৪৬ টি ফাউল থেকে।
ধারাবাহিক পর্ব গুলোতে আমার লেখায় কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে। হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিবেন।
সমাপ্ত
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার