প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৯:৫১
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস
বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য দিবস আমাদের জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়। তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস—বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস, যা প্রতিবছর ২৮ জুলাই পালিত হয়। দিবসটির এই বছরের প্রতিপাদ্য “Let’s Break It Down”—অর্থাৎ হেপাটাইটিস সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা ভেঙে সঠিক তথ্য, সময়মতো পরীক্ষা এবং কার্যকর চিকিৎসাকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
সহজ ভাষায়, হেপাটাইটিস বলতে যকৃত বা লিভারের প্রদাহ বোঝায়। লিভার মানবদেহের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিপাকীয় (Metabolic) অঙ্গ। একে মানবদেহের ‘রাসায়নিক গবেষণাগার’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। আমাদের খাওয়া খাবারকে শক্তিতে রূপান্তর করা, শরীর থেকে ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ, প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও এনজাইম তৈরি, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ সঞ্চয় এবং চর্বি হজমের জন্য প্রয়োজনীয় পিত্তরস (Bile) উৎপাদন—সবই এই অঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ফলে লিভারে প্রদাহ দেখা দিলে শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
হেপাটাইটিস বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ, অতিরিক্ত মদ্যপান, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (যেমন: আইসোনিয়াজিড, কিছু অ্যান্টিফাঙ্গাল জাতীয় ওষুধ), অটোইমিউন ডিজিজ (যেমন: প্রাইমারি বিলিয়ারি কোলাঞ্জাইটিস) এবং বিপাকীয় সমস্যা অন্যতম। তবে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিসই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এজন্য জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় হেপাটাইটিস এ, বি, সি এবং ই ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও আমাদের ইপিআই কর্মসূচিতে শিশুদের জন্য হেপাটাইটিস বি টিকা অন্তর্ভুক্ত করার ফলে এই ভাইরাসের সংক্রমণ কমছে, তবুও প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস এখনও একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ৪% মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত।
হেপাটাইটিসের উপসর্গ ও লক্ষণের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো জন্ডিস—প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হয়ে যাওয়া এবং চোখ ও ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, জন্ডিস কোনো রোগ নয়; এটি হেপাটাইটিসের একটি লক্ষণ মাত্র। এ ছাড়া দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব কিংবা পেটের ডান পাশে অস্বস্তি বা ব্যথা হতে পারে। আবার হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে অনেক সময় বছরের পর বছর কোনো উপসর্গই প্রকাশ পায় না। এই কারণে হেপাটাইটিস বি ও সি-কে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হেপাটাইটিস এ ও ই মূলত দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। তাই নিরাপদ পানি পান, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস এই দুই ভাইরাস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
হেপাটাইটিস এ সাধারণত স্বল্পমেয়াদি সংক্রমণ এবং অধিকাংশ রোগী দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসাই যথেষ্ট। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ, ভেষজ ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ কিছু ওষুধ লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
জন্ডিসের রোগীদের মধ্যে খাবার নিয়ে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, জন্ডিস হলে কেবল তরল খাবার খেতে হবে অথবা হলুদ দিয়ে রান্না করা খাবার খাওয়া যাবে না। বাস্তবে এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ভাইরাল হেপাটাইটিসে রোগীকে সুষম ও সহজপাচ্য খাবার খেতে হবে। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুড কিছুদিন এড়িয়ে চলাই ভালো। পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত পানি বা গ্লুকোজের শরবত পান করলে রক্তের বিলিরুবিনের মাত্রা কমে যায়—এ ধারণাও সঠিক নয়।
অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি ও সি মূলত সংক্রমিত রক্ত ও শরীরের নির্দিষ্ট তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। নিরাপত্তাহীন রক্ত সঞ্চালন, একই সূঁচ বা সিরিঞ্জ একাধিকবার ব্যবহার, জীবাণুমুক্ত না করা অস্ত্রোপচারের যন্ত্র, ট্যাটু বা পিয়ার্সিংয়ের দূষিত সরঞ্জাম এবং হেপাটাইটিস বি-এর ক্ষেত্রে মা থেকে নবজাতকের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। তাই রক্ত গ্রহণের আগে যথাযথ স্ক্রিনিং নিশ্চিত করা, প্রতিবার নতুন বা জীবাণুমুক্ত সিরিঞ্জ ব্যবহার করা এবং সেলুনে শেভ করার সময় নতুন ব্লেড ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।
ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং সময়মতো শনাক্তকরণ। হেপাটাইটিস বি-এর কার্যকর ও নিরাপদ টিকা রয়েছে, যা জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের দেওয়া হয় এবং প্রাপ্তবয়স্করাও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করতে পারেন। সাধারণত ০, ১ ও ৬ মাসে মোট তিন ডোজ টিকা দেওয়া হয়। অন্যদিকে হেপাটাইটিস সি-এর কোনো টিকা নেই, তবে বর্তমানে অত্যন্ত কার্যকর Direct-Acting Antiviral (DAA) ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, নিরাপদ রক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ইনজেকশন এড়িয়ে চলা, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করা, নিরাপদ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি গ্রহণ করা, হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নেওয়া এবং ঝুঁকিতে থাকলে হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করানো। আমাদের সচেতনতা, প্রতিরোধমূলক আচরণ এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মতো জটিলতা প্রতিরোধ করতে এবং একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেনারেল প্র্যাকটিশনার, গ্রীন লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সুনামগঞ্জ।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন