টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ সীমানা নির্ধারণ করুন

প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২০

গত ১ আগস্ট সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক একটি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান চলাচলের জন্য ১১ দফা নির্দেশনা জারি করেছেন। টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ ২০২৫ এর আলোকে তিনি এই নির্দেশনা জারি করেছেন। নির্দেশনা অনুসারে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সকল প্রকার যান্ত্রিক নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করাসহ পর্যটক ও নৌযানের জন্য বিভিন্ন অনুসরণীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিপন্ন টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষার বিষয়টি এখন জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং এই প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসকের জারিকৃত গণবিজ্ঞপ্তি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটনের নামে বিশাল বিশাল হাউসবোটসহ নানবিধ যান্ত্রিক জলযানের অবাধ বিচরণ ও পর্যটকদের দ্বারা বিভিন্ন প্রকারে পরিবেশ দূষণের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা অধ্যাদেশ অনুসারে এই দুই হাওরের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া আছে। বাস্তবে এইসব নির্দেশনা টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রতিপালিত হতে দেখা যায় না। প্রশাসনিকভাবে বারংবার এইসব নির্দেশনা অবহিত করা সত্ত্বেও তা উপেক্ষিত হতে দেখা যায়। এখন দেখার বিষয় হলো, জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ গণবিজ্ঞপ্তির ফলে তা কতটুকু নিয়ন্ত্রণে আসে। আমাদের দেশে পর্যটকদের মন—মানসিকতা পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠেনি। এর কারণ নিয়ম মানার জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দরকার তার ব্যাপক ঘাটতি। কাগজে—পত্রে বহু আইন, নিয়ম, বিধি বা নির্দেশনা আছে। কিন্তু সেগুলো কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রের যদি পর্যাপ্ত দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকে তাহলে মানুষের মধ্যে নিয়ম পালনের অভ্যাস তৈরি হয় না। টাঙ্গুয়ার হাওরের ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরনের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করি।    

 


২০২৫ সনে হাওর সুরক্ষা আদেশ জারির উদ্দেশ্য ছিলো, ‘হাওর এলাকার পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রতিপালন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা যা হাওর দু’টির অনন্য বৈশিষ্ট্য, নৈসর্গিক আবেদন ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করবে’। আদেশে টাঙ্গুয়ার হাওরের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা উত্তর ও দক্ষিণ এবং তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের যথাক্রমে টাঙ্গুয়ার হাওর, মোয়াজ্জেমপুর, কিসমত মেন্দাতা, জগদীশপুর, লামাগাঁও, রাঙ্গাছড়া পূর্ব মৌজাকে সুরক্ষা আদেশের আওতাভুক্ত এলাকা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরক্ষা আদেশের আওতাধীন এলাকায় কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না সে বিষয়ে আদেশের ৩ নং অনুচ্ছেদে ১৯টি বিধি—নিষেধ দেয়া আছে। আদেশের ৫ অনুচ্ছেদে এই বিধি—নিষেধ প্রতিপালিত হচ্ছে কি—না তা পরিবীক্ষণ ও বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ৫.২ অনুচ্ছেদে কমিটির কার্যপরিধি নির্ধারিত আছে। সুরক্ষা আদেশে টাঙ্গুয়ার হাওরের চিহ্নিত এলাকার কোন অংশ সংবেদনশীল বা সংকটাপন্ন তা উল্লেখ নেই। এজন্য নানারূপ অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। তবে সাধারণভাবে ধারণা করা যায়, আদেশভুক্ত পুরো এলাকাই ইসিএভুক্ত। সুরক্ষা আদেশে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির কার্যপরিধির (গ) উপঅনুচ্ছেদ অনুসারে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর বা হাওর অধিদপ্তরকে হাওরের সংবেদনশীল এলাকা চিহ্নিতকরণের দায়িত্ব দেয়া আছে। এইসব এলাকায় হাউসবোট বা পর্যটকবাহী নৌযান প্রবেশ করতে পারবে না। হাওরের সংবেদনশীল অঞ্চল চিহ্নিতকরণ হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ হাওরের প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র রক্ষায় এই ইসিএ এলাকা চিহ্নিত করা অতি জরুরি। 

 


টাঙ্গুয়ার হাওর মিঠাপানির মাছের প্রজননস্থল হিসাবে বিখ্যাত ছিলো। এই হাওরে পরিযায়ী পাখির মেলা বসতো। ছিলো নানা বিরল প্রজাতির আরও বহু পাখি। এই হাওর নানা জাতের উদ্ভিদ, লতা—গুল্ম ও জলজ প্রাণীর সমৃদ্ধ ভাণ্ডার ছিলো। এখন এর কিছুই নেই। এখন পর্যটনকে সামনে এনে হাওরের সম্পদ বিনষ্ট করার দায়কে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ হাওরবাসীর প্রধান দাবি হাওরের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। কখনও প্রকৃতি—পরিবেশ নষ্ট করে পর্যটনকে উৎসাহিত করা হয় না। হাওরের ক্ষতির জন্য যে কেবল অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনই দায়ী তা নয়। বরং হাওরে কীটনাশক ও সারের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার, মাছ ও বৃক্ষ লুণ্ঠন. অবৈধ পাখি শিকার প্রভৃতির সম্মিলিত যোগফলই বর্তমান ঐশ^র্যহীন টাঙ্গুয়ার হাওর। টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনার জন্য সরাসরি হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্ব গ্রহণ আবশ্যক বলে আমরা মনে করি। পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি টাঙ্গুয়ার হাওরের গৌরবোজ্জ্বল উৎপাদনশীলতা ও বৈচিত্র ফিরিয়ে আনতে জরুরিভিত্তিতে হাওরের সংবেদনশীল এলাকা চিহ্নিত করে সকল বিধি—নিষেধ মানার ব্যবস্থাপনা কাঠামো দাঁড় করানোর জন্য আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার