আয়কর টাউট থেকে সাবধান

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:৫৮

করদাতার পাশে আইন, নাকি দালালের দৌরাত্ম্য?

আয়কর একটি আইনভিত্তিক ব্যবস্থা। এখানে কোনো ব্যক্তির কথার জোর, ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা ‘অফিসে আমার লোক আছে’—এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইন, নথি, হিসাব, প্রমাণ এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আয়কর বিষয়ে সাধারণ করদাতার অজ্ঞতা ও ভয়কে পুঁজি করে এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন কর অফিসের সব দরজা তাদের জন্য খোলা। তারা কখনো বলেন—‘সব ম্যানেজ করে দেব’, কখনো বলেন—‘কর্তার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক’, আবার কখনো করদাতাকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের মাধ্যমে কাজ করানোর চেষ্টা করেন।

 


এখানেই প্রশ্ন আসে—
একজন করদাতা কার হাতে তার আয়, সম্পদ, ব্যবসা, ব্যাংক হিসাব ও ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য তুলে দেবেন?
উত্তরটি হওয়া উচিত—আইন যাকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, সেই আইনসম্মত ব্যক্তির কাছেই।
ধারা ৩২৭-এর গুরুত্ব
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩২৭ করদাতার পক্ষে আয়কর কর্তৃপক্ষ বা আপিল ট্রাইব্যুনালে হাজিরার জন্য ‘অনুমোদিত প্রতিনিধি’-র বিধান করেছে। আইনের বর্তমান কাঠামোয় নির্দিষ্ট আত্মীয়, করদাতার পূর্ণকালীন নিয়মিত কর্মচারী এবং ‘কর আইনজীবী’ নির্ধারিত শর্তে অনুমোদিত প্রতিনিধি হতে পারেন।
আর ‘কর আইনজীবী’ হওয়ার ক্ষেত্রেও আইনে নির্দিষ্ট যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের সংশোধনসহ বর্তমান বিধানে নির্দিষ্ট শ্রেণির কর আইনজীবীর বোর্ডের সনদ এবং নিবন্ধিত কর আইনজীবী সমিতির সদস্যপদের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, কেউ শুধু ‘আমি ট্যাক্সের কাজ করি’ বললেই তিনি করদাতার আইনগত প্রতিনিধি হয়ে যান না।
‘টাউট’ চেনার একটি সহজ উপায়
কেউ যদি বলেন—
“আপনার কোনো চিন্তা নেই, আমি সব ম্যানেজ করে দেব।”
তাহলে প্রশ্ন করুন—
“কোন আইনের অধীনে আপনি আমার হয়ে কাজ করবেন?”
কেউ যদি বলেন—
“অফিসে আমার বিশেষ পরিচয় আছে।”
তাহলে বলুন—
“পরিচয়ের প্রয়োজন নেই; আইনগত প্রক্রিয়াটি কী, সেটি বলুন।”
কেউ যদি বলেন—
“আপনার কর অনেক কমিয়ে দেব।”
তাহলে জিজ্ঞাসা করুন—
“কোন বিধানের অধীনে কর কমবে? হিসাবটা দেখান।”
আইনসম্মত কর-পরামর্শের উত্তর সাধারণত আইন, হিসাব ও নথি দিয়ে দেওয়া যায়।
করদাতার সবচেয়ে বড় ভুল কোথায়?
অনেক করদাতা মনে করেন, ‘যে কম টাকায় কাজ করে দেবে, তাকেই দেওয়া ভালো।’
কিন্তু আয়কর ফাইল কোনো সাধারণ কাগজপত্রের ফাইল নয়। এর সঙ্গে একজন মানুষের আয়, সম্পদ, বিনিয়োগ, ব্যবসা, ব্যাংক হিসাব এবং আর্থিক ইতিহাস জড়িত থাকতে পারে।
ভুল পরামর্শে একটি রিটার্ন দাখিল হলে তার প্রভাব পরবর্তী করবর্ষেও পড়তে পারে। ভুল তথ্য, ভুল হিসাব বা ভুল আইনি অবস্থানের কারণে করদাতা পরবর্তীতে নোটিশ, কর নির্ধারণ, অতিরিক্ত করদায় কিংবা আপিলের মতো জটিলতার মুখোমুখি হতে পারেন।
তাই—
কম খরচের প্রলোভনের চেয়ে সঠিক আইনি পরামর্শ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘দালাল’ নয়, আইনভিত্তিক সেবা চাই
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা বা প্রমাণ ছাড়া ‘টাউট’ বলে অভিযুক্ত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।
বরং প্রশ্ন হলো—কে আইনগতভাবে কী কাজ করতে পারেন?

 


যে ব্যক্তি আইনগতভাবে করদাতার প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্য নন, অথচ করদাতার হয়ে আয়কর অফিসে কাজ করার নামে অর্থ গ্রহণ করেন বা প্রভাব খাটানোর প্রতিশ্রুতি দেন, তার ব্যাপারে করদাতার অবশ্যই সতর্ক হওয়া উচিত।
কারণ একজন করদাতা যেন বুঝতে পারেন—
আইনজীবী আর মধ্যস্বত্বভোগী এক জিনিস নয়।
আইনগত প্রতিনিধি আর ‘সব ম্যানেজ করে দেওয়া’ ব্যক্তি এক জিনিস নয়।
আইনভিত্তিক পরামর্শ আর ব্যক্তিগত প্রভাবের দাবি এক জিনিস নয়।

 


করদাতার পাঁচটি সতর্কতা
১. পরিচয় যাচাই করুন।
আপনার পক্ষে যিনি কাজ করবেন, তার আইনগত পরিচয় ও যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
২. নথি নিজের কাছে রাখুন।
রিটার্ন, চালান, নোটিশ, হিসাব ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজের কপি সংরক্ষণ করুন।
৩. ‘ম্যানেজ’ কথায় বিশ্বাস করবেন না।
কোন আইনের অধীনে কী সুবিধা পাওয়া যাবে—তা লিখিতভাবে বা আইনের ভিত্তিতে বুঝে নিন।
৪. অর্থ লেনদেনে প্রমাণ রাখুন।
যে কোনো পেশাগত সেবার বিনিময়ে অর্থ প্রদান করলে যথাযথ প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
৫. আইন যাচাই করুন।

 


প্রয়োজনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত আইন, সংশোধনী, এসআরও, নির্দেশনা ও অন্যান্য সরকারি তথ্য যাচাই করুন। NBR বর্তমানে আয়কর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান প্রকাশ করছে।
পেশার মর্যাদা রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব
কর আইনজীবীর দায়িত্ব শুধু একটি রিটার্ন প্রস্তুত করা নয়। একজন করদাতাকে আইন সম্পর্কে সচেতন করা, তার বৈধ অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা এবং আইনসম্মত উপায়ে কর-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করাও পেশাগত দায়িত্বের অংশ।
একই সঙ্গে করদাতারও দায়িত্ব রয়েছে—কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করা।
যিনি সত্যিই আইন জানেন, তিনি আইনের ধারা দেখাতে পারবেন।
যিনি সত্যিই হিসাব বোঝেন, তিনি হিসাব ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
যিনি সত্যিই আইনসম্মতভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন, তিনি তার আইনগত পরিচয় স্পষ্ট করতে পারবেন।
তাই করদাতাকে ভয় দেখিয়ে নয়, আইন বুঝিয়ে সেবা দিতে হবে।

 


শেষ কথা
বাংলাদেশের করব্যবস্থা যত আধুনিক হচ্ছে, করদাতার সচেতনতার প্রয়োজনও তত বাড়ছে। একজন করদাতা যেন তার কষ্টার্জিত অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য ও আইনগত অধিকার কোনো অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে তুলে না দেন—এটি নিশ্চিত করা জরুরি।
মনে রাখতে হবে—
“আয়কর অফিসে পরিচয় নয়, আইন কথা বলে।
প্রভাব নয়, নথি কথা বলে।
প্রতিশ্রুতি নয়, প্রমাণ কথা বলে।”
সুতরাং করদাতাদের প্রতি আহ্বান—
আয়কর-সংক্রান্ত কাজে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার আগে তার আইনগত যোগ্যতা যাচাই করুন। ‘সব ম্যানেজ করে দেব’—এই কথায় নয়, আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন।
একটি স্বচ্ছ করব্যবস্থা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; সচেতন করদাতা, দায়িত্বশীল পেশাজীবী এবং আইনসম্মত করচর্চার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি জবাবদিহিমূলক করব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।

 


সচেতন হোন।
আইন জানুন।
টাউট থেকে দূরে থাকুন।
আইনসম্মত করসেবা গ্রহণ করুন।

 


লেখক : কর আইনজীবি, সুনামগঞ্জ  জেলা কর আইনজীবী সমিতি 
অডিটর কার্যনির্বাহী কমিটি (২০২৬-২০২৭), সুনামগঞ্জ জেলা কর আইনজীবী সমিতি

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার