প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৮
একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা—বাণিজ্য কিংবা সরকারি রাজস্বের পরিসংখ্যান দিয়ে গড়ে ওঠে না। এর ভিত তৈরি হয় প্রতিটি নাগরিকের ছোট ছোট আর্থিক দায়িত্ববোধের ওপর। সেই দায়িত্ববোধের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো আয়কর। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অনেক করদাতা এখনো কর প্রদানকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখেন। অথচ একজন সচেতন করদাতার দায়িত্ব শুধু কর দেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; নিজের আয়, সম্পদ, দায়, আর্থিক লেনদেন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখাও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
একজন করদাতার আর্থিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো আয়কর রিটার্ন। রিটার্ন শুধু একটি ফরম পূরণ করে জমা দেওয়ার বিষয় নয়; এটি একজন ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট সময়ের আর্থিক অবস্থার একটি আনুষ্ঠানিক বিবরণ। তাই রিটার্নে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সততা, নির্ভুলতা ও দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত জরুরি। কোনো তথ্য গোপন করা, অনুমাননির্ভর তথ্য দেওয়া কিংবা যাচাই না করে অন্যের তৈরি হিসাবের ওপর নির্ভর করা ভবিষ্যতে করদাতার জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আমার পেশাগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক সমস্যার শুরু হয় কর না দেওয়ার কারণে নয়; বরং অগোছালো আর্থিক নথি ও অসচেতনতার কারণে। ব্যাংক হিসাব, জমি—ফ্ল্যাট ক্রয়, ব্যবসায়িক লেনদেন, বিনিয়োগ, ঋণ, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ কিংবা বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন—এসবের যথাযথ কাগজপত্র সংরক্ষণ না করলে পরবর্তীতে নিজের অর্থের বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তাই একজন করদাতার প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত নিজের আর্থিক জীবনের একটি পরিষ্কার হিসাব রাখা। আয় কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে ব্যয় হয়েছে, কী সম্পদ অর্জিত হয়েছে, কোনো দায় বা ঋণ আছে কি না—এসব বিষয়ে নিজের কাছেই স্বচ্ছ থাকা প্রয়োজন। কর প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হলে সঠিক নথি ও তথ্যই একজন করদাতার সবচেয়ে বড় সহায়তা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময় সম্পর্কে সচেতনতা। রিটার্ন দাখিল, কর পরিশোধ, নোটিশের জবাব কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময় ও প্রযোজ্য বিধান জানা জরুরি। ‘সময় হলে দেখা যাবে’—এই মানসিকতা অনেক সময় ছোট একটি বিষয়কে বড় সমস্যায় পরিণত করতে পারে।
এখানেই একজন দক্ষ কর আইনজীবীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কর আইনজীবী শুধু রিটার্ন পূরণ বা জমা দেওয়ার সহায়ক নন; তিনি করদাতাকে আইন বুঝতে, সঠিক তথ্য উপস্থাপন করতে, প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখতে এবং আইনসম্মতভাবে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব পালন করতে সহায়তা করতে পারেন। তবে শেষ পর্যন্ত নিজের আর্থিক তথ্য সম্পর্কে সত্য ও সচেতন থাকা করদাতারই দায়িত্ব।
আমাদের কর সংস্কৃতিতে তাই একটি পরিবর্তন প্রয়োজন—করকে ভয় নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখা; রিটার্নকে ঝামেলা নয়, নিজের আর্থিক পরিচয়ের দলিল হিসেবে দেখা।
মনে রাখতে হবে—কর দেওয়া রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব, সঠিক তথ্য দেওয়া আইনের প্রতি দায়িত্ব, নথি সংরক্ষণ করা নিজের ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্ব, আর নিজের অধিকার ও কর্তব্য জানা একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
একজন দায়িত্বশীল করদাতা শুধু নিজের কর—জটিলতা কমান না; তিনি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের অংশীদারও হয়ে ওঠেন।
লেখক : কর আইনজীবী, অডিটর—কার্যনির্বাহী কমিটি ২০২৬—২০২৭, সুনামগঞ্জ জেলা কর আইনজীবী সমিতি
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন