প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৪৩
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর খেলার মাঠের চারপাশে আবাসিক এলাকা। অথচ এই মাঠকে ঘিরেই বছরের পর বছর নানা নামে আয়োজন করা হচ্ছে বাণিজ্য মেলা। আমি একে বলি ‘মেলা বাণিজ্য’। কারণ, মেলার আড়ালে এখানে নানা মত ও পথের মানুষের বাণিজ্য, ধান্ধা ও ভাগ—বাটোয়ারার নানা হিসাব—নিকাশ থাকে। এক মাসের কথা বলে মেলার আয়োজন শুরু হয়, চলে দুই মাস, কখনো আড়াই মাসও। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আশপাশের আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের কী পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা আয়োজকদের বিবেচনায় থাকে বলে মনে হয় না।
একটি মেলা মানুষের বিনোদন ও বাণিজ্যের উপলক্ষ হতে পারে। স্থানীয় অর্থনীতিতেও কিছু অবদান রাখতে পারে। কিন্তু সেই আয়োজন যখন অন্যের স্বাভাবিক জীবনযাপন, শান্তি ও স্বস্তি কেড়ে নেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—কার স্বার্থে এই আয়োজন? মেলার বাণিজ্যিক লাভের হিসাব কি এলাকাবাসীর দুর্ভোগের চেয়ে বড়?
গভীর রাত পর্যন্ত মাইকের উচ্চশব্দে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়ে। আবাসিক এলাকার কোনো কোনো ঘরে আছেন বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ রোগী। আছে স্কুল—কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, যাদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন শান্ত পরিবেশ। অথচ মেলার শব্দদূষণে সেই পরিবেশটুকুও থাকে না। তার সঙ্গে আছে যানজট, চলাচলে বিঘ্ন এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা ভোগান্তি। মেলার আনন্দ এক পক্ষের, যন্ত্রণা যেন অন্য পক্ষের!
এসব নিয়ে এলাকাবাসী ও শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বহুবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হয়েছে বিক্ষোভ, মানববন্ধন, দেওয়া হয়েছে স্মারকলিপি। কিন্তু তাতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। অনুমতি দেওয়ার সময় কর্তৃপক্ষ যেসব শর্ত আরোপ করে, আয়োজকেরা সেগুলো কতটা মানেন, তা দেখার দায়িত্বও তো কারও না কারও রয়েছে। বাস্তবে মেলা শুরু হওয়ার পর শর্তগুলো যেন গুরুত্ব হারায়। তাহলে অনুমতির শর্ত থাকে কেন? তদারকিই বা হয় না কেন?
এবার অন্তত একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সামনে স্কুলশিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষার আগে মেলার আয়োজন না করে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর করা হোক। এটি কোনো মেলার বিরোধিতা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতির প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধের দাবি। ব্যবসা—বাণিজ্যের জন্য সময়ের অভাব হবে না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সময় তো নির্দিষ্ট। সেই সময়টুকুতে তাদের শান্তিতে পড়াশোনা করার সুযোগ দেওয়া কি খুব বেশি কিছু চাওয়া?
আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসে—বাণিজ্য মেলার জন্য আবাসিক এলাকার মাঝখানে অবস্থিত ষোলঘর খেলার মাঠই কেন বারবার বেছে নিতে হবে? জেলা স্টেডিয়াম কি বিকল্প হতে পারে না? সেখানে নিয়মিত খেলাধুলার তৎপরতা চোখে পড়ে না। উপযুক্ততা যাচাই করে স্টেডিয়াম কিংবা অন্য কোনো নির্ধারিত স্থানে মেলার আয়োজন করা গেলে আবাসিক এলাকার মানুষ অন্তত দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
আমরা আরও আগে থেকেই বলছি, সুরমা নদীর ওপারে হাউজিং এস্টেট এলাকায় মেলার আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করা হোক। একসময় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এমন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশ্ন হলো, জনদুর্ভোগ কমানোর একটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়, অথচ তা বাস্তবে রূপ পায় না কেন?
সুনামগঞ্জ—৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনি আমাদের ভরসার জায়গা। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে অন্তত শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার আগে মেলার আয়োজন বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করুন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আবাসিক এলাকার মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে মেলার উপযুক্ত স্থান নির্ধারণের উদ্যোগ নিন।
মেলা হোক, বাণিজ্যও হোক। কিন্তু তার জন্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হবে কেন? অসুস্থ মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া হবে কেন? আবাসিক এলাকার মানুষকে মাসের পর মাস শব্দদূষণ ও যানজটের শাস্তি পেতে হবে কেন?
উন্নয়ন কিংবা বিনোদনের কোনো আয়োজনই মানুষের স্বস্তি, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকারের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। সুনামগঞ্জের অগণিত মানুষ চান, শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই মেলার আয়োজন করা হোক। অন্তত এইটুকু মানবিক বিবেচনা যেন এবার উপেক্ষিত না হয়।
লেখক : সাংবাদিক ও আইনজীবী, সুনামগঞ্জ।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন