বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬: বাস্তব অভিজ্ঞতা শুনি, গড়ে তুলি সহমর্মী সমাজ

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:২৪

আজ ১০ অক্টোবর, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস (World Mental Health Day 2026)। এই দিবসের এই বছরের প্রতিপাদ্য: “Lived experiences heard: real voices, real change” (বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনা: প্রকৃত কণ্ঠস্বর, প্রকৃত পরিবর্তন)। এই প্রতিপাদ্য আমাদের এটিই মনে করিয়ে দেয় যে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এমন মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই পারে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে।

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮.৭ শতাংশ এবং ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রায় ১২.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং তীব্র মানসিক চাপ একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। লিঙ্গভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, নারীদের মধ্যে মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব পুরুষদের তুলনায় বেশি। সমীক্ষা অনুযায়ী, নারীদের আক্রান্তের হার ২১.৫ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ১৫.৭ শতাংশ। 

অন্যদিকে, শহর ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামগ্রিক মানসিক রোগের হারে তেমন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা না গেলেও (শহরে ১৮.৯ শতাংশ এবং গ্রামে ১৮.৭ শতাংশ) নগরজীবনের তীব্র প্রতিযোগিতা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চয়তা অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

 

মানসিক অসুস্থতার ধরন ও সাধারণ লক্ষণ
মানসিক অসুস্থতা একক কোনো রোগ নয়; এর রয়েছে বিভিন্ন ধরন। যেমন—বিষণ্নতা (Depression), উদ্বেগজনিত রোগ (Anxiety Disorders), বাইপোলার ডিসঅর্ডার (Bipolar Disorder) এবং সাইকোটিক ডিসঅর্ডার (Psychotic Disorders)। মানসিক সমস্যার ধরনভেদে লক্ষণও ভিন্ন হয়। তবে কিছু লক্ষণের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন:

দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলা: টানা দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে মন খারাপ থাকা, আগে ভালো লাগত এমন কাজেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
অতিরিক্ত উদ্বেগ ও ভয়: দৈনন্দিন সাধারণ বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা বা আতঙ্ক অনুভব করা, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আচরণ ও মেজাজের পরিবর্তন: অস্বাভাবিক বিরক্তি, অতিরিক্ত রাগ, সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া অথবা নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নেওয়া।
ঘুম ও ক্ষুধার পরিবর্তন: স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত বা কম ঘুমানো, ঘুমের সমস্যা কিংবা খাওয়ার রুচি ও ওজনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
বাস্তবতা উপলব্ধিতে সমস্যা: বাস্তবে উপস্থিত নেই এমন কিছু দেখা বা শোনা (Hallucination) কিংবা বাস্তব প্রমাণের সঙ্গে অসংগত দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা (Delusion)।

মানসিক অসুস্থতা সাধারণত কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয় না। বরং জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক-পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক প্রভাবে এর বিকাশ ঘটতে পারে। মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণের এক বা একাধিকটি থাকলেই মানসিক রোগ নিশ্চিত হয় না। লক্ষণের স্থায়িত্ব, তীব্রতা, দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

 

 

চিকিৎসাসেবার ঘাটতি ও সামাজিক কলঙ্ক
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসার ঘাটতি (Treatment Gap)। বিভিন্ন সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২.৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪.৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক বা পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পান না। এই ঘাটতির পেছনে রয়েছে সামাজিক কুসংস্কার, লোকলজ্জা, সচেতনতার অভাব, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা এবং সেবাকেন্দ্রে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা। অনেকেই ‘পাগল’ বা ‘মানসিকভাবে দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে চিকিৎসা নিতে চান না। পরিবার ও বৈবাহিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও অনেককে চিকিৎসা গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। ফলে অনেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না নিয়ে কবিরাজি, ওঝার আশ্রয় কিংবা অন্যান্য অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। এতে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা বিলম্বিত হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে।

 

 

বিজ্ঞান ও ধর্মের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি
মানসিক অসুস্থতাকে শুধু অলৌকিক বিষয়, জিন-ভূতের প্রভাব কিংবা ব্যক্তির ধর্মীয় দুর্বলতার ফল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান মানসিক অসুস্থতাকে মস্তিষ্ক, শরীর, মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। তাই হৃদরোগ বা লিভারের রোগের মতোই মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রেও যথাযথ মূল্যায়ন, চিকিৎসা ও পরিচর্যা প্রয়োজন। রোগভেদে সাইকোথেরাপি (Psychotherapy), ওষুধ, জীবনযাপনে পরিবর্তন, সামাজিক সহায়তা কিংবা এসবের সমন্বিত প্রয়োগ কার্যকর হতে পারে।

প্রার্থনা, ইবাদত ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন অনেকের মানসিক প্রশান্তিতে সহায়ক হতে পারে; তবে এগুলো প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প নয়। বিশেষ করে, ঝাড়ফুঁক বা অন্য কোনো আচার পালনের নামে রোগীকে মারধর, শারীরিক নির্যাতন, আটকে রাখা কিংবা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা অমানবিক ও বিপজ্জনক। এমন আচরণের বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও চিকিৎসা গ্রহণের কোনো বিরোধ নেই। ইসলামে অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার নিরাময় তিনি সৃষ্টি করেননি।” (সহিহ বুখারি)। 

 

 

উপসংহার: শুনি, বুঝি, পাশে দাঁড়াই
মানসিক অসুস্থতা লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়, লজ্জারও নয়। এর জন্য প্রয়োজন সহমর্মিতা, সঠিক তথ্য, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা। পরিবারের একজন সদস্যের পরিবর্তিত আচরণকে উপহাস না করে তাঁর কথা শোনা, বন্ধুর কষ্টকে অবহেলা না করা এবং প্রয়োজনে তাঁকে পেশাদার সহায়তা নিতে উৎসাহিত করা—এসব ছোট পদক্ষেপও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। এর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সমন্বিত করা, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি, সেবার ব্যয় কমানো এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

তাই আসুন, এই বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে আমরা শুধু কথা না বলে মন দিয়ে মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তির বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শুনি, মানুষের পাশে দাঁড়াই—গড়ে তুলি মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী, সহমর্মী ও মানবিক সমাজ।

লেখকঃ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেনারেল প্র্যাকটিশনার, গ্রীন লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সুনামগঞ্জ।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার