প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৪৭
‘নগর স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প’—এ সুনামগঞ্জ পৌরসভার যুক্ত হওয়ার বিষয়টি পৌরবাসীর জন্য একটি আনন্দসংবাদ। দেশের ৩২৭ পৌরসভার মধ্যে কেবল ২২টি পৌরসভাকে এই প্রকল্পের আওতায় নেয়া হয়েছে। ২২টি পৌরসভার মধ্যে সুনামগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি পৌরসভার বর্তমান প্রশাসকের কর্মদক্ষতার পরিচয়বাহী। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে সুনামগঞ্জ পৌরসভার অন্তর্ভুক্তির জন্য তাঁকে অভিনন্দন। পৌর প্রশাসক জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে পৌরসভার ড্রেনেজ ও সড়ক উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পৌরসভার সামর্থ বাড়াতে সহায়তা পাওয়া যাবে। কিছুদিন আগে সুনামগঞ্জ পৌরসভার অনুরূপ আরেকটি প্রকল্পভুক্ত হওয়ার খবরের পর নতুন এই প্রকল্পের সংবাদ সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে একটি আধুনিক শহরে রূপান্তরের নাগরিক প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক বলে আমরা মনে করি। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ কোটি টাকার সহায়তা পাওয়া যাবে বলে অনলাইন তথ্যে জানা যায়। সুনামগঞ্জ পৌরসভা কাগজেপত্রে ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা হলেও এই শহরের নাগরিক সুবিধাদিসহ অন্যান্য জায়গায় এখনও প্রচুর ঘাটতি বিদ্যমান।
সুতরাং এই ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প পাওয়া ও স্বচ্ছতার সাথে প্রকল্প কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হলে পৌরশহরের অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে নিঃসন্দেহে। শতাব্দী প্রাচীন সুনামগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান আয়তন প্রায় ২২ বর্গ কিলোমিটার। এক লাখের উপরে মানুষ বসবাস করেন এই শহরে। ৯টি ওয়ার্ডে বিভক্ত পৌর এলাকায় অর্ধ শতের মতো পাড়া বা মহল্লার অবস্থান। পৌরসভার সর্বত্র এখনও আধুনিক সেবা ব্যবস্থা চালু করা যায়নি। বিশেষ করে বর্ধিত পৌর অঞ্চলে এখনও ভালো করে সড়ক ও ড্রেনেজ সুবিধাদি গড়ে উঠেনি। ড্রেনেজ সমস্যা মূলত পুরো পৌরসভার একটি বড় সমস্যা। শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট করে পাকা ড্রেন চালু করা ও অপরিকল্পিত বাসা—বাড়ি ও সড়ক নির্মাণ করায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। এখন একটু বৃষ্টি হলেই শহরের নানা জায়গায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। উন্নয়নের অর্থ কেবল কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণ নয়। বরং প্রকৃতির সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থাদির যথাযথ সমন্বয়ের নামই উন্নয়ন। এক্ষেত্রে শহরের পুরনো খালগুলোর প্রবাহ নষ্ট করে এবং এ সব খাল দখল ও ভরাট করার মধ্য দিয়ে বহু আগেই শহরের আদি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করা হয়েছে। শহরের পুরনো বড় খালগুলো পুনরুদ্ধার ও সচল করার দাবি নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের। পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন তাঁরাও এইসব খাল পুনরুদ্ধারের দাবিতে আইনি ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করেছেন। মাঝেমধ্যে খাল উদ্ধারের কিছু লোক—দেখানো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলেও তা আর স্থায়িত্ব পায় না। তাই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থারও প্রত্যাশিত উন্নয়নও অনুপস্থিত। এখন সময় এসেছে, শহরের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করা। এক্ষেত্রে আলোচ্য প্রকল্পটি যাতে সহায়ক হতে পারে তাই আমাদের কামনা।
শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবস্থা একেবারেই নাজুক। যার ইচ্ছা যেখানে সেখানে ময়লা—আবর্জনা ফেলে শহরের পরিবেশ ও সৌন্দর্য নষ্ট করা হচ্ছে। শহর পাশ^র্বর্তী সকল খোলা স্থান, নদীর পাড়, সড়কের কিনারা ইত্যাদি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণে নাগরিকদের জনস্বাস্থ্য সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। নাগরিকরা যেমন বর্জ্য ফেলার ক্ষেত্রে সচেতনতা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন তেমনি পৌরসভাও এক্ষেত্রে নাগরিক অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। আমরা এর আগে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে উল্লেখ করেছিলাম, প্রতিটি পাড়া—মহল্লা ও বাজার এলাকায় প্রচুর উন্নত মানের প্লাস্টিক বিন বসানোর জন্য। বাধ্যতামূলকভাবে এ সমস্ত বিনে বর্জ্য ফেলাকে বাধ্যতামূলক করা এবং নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বর্জ্য অপসারণের উত্তম চর্চাকে পূর্বশর্ত হিসেবে আরোপ করার জন্য। বাস্তবে শহরে পর্যাপ্ত প্লাস্টিক বিনের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায় না। এখন শুকনো মৌসুম এসে গেছে। শহরের রাস্তা—ঘাটগুলো ধুলিময় থাকবে। রাস্তা—ঘাটে নিয়মিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা থাকলে ধুলোর যন্ত্রণা থেকে নাগরিকরা রেহাই পেতেন।
শহরবাসী নিয়মিত সেবা পাওয়ার জন্য পৌরসভাকে কর দেন। সরকারও নানাভাবে সহায়তা দেয়। পৌরসভার রয়েছে নিজস্ব আয়ের বহু ব্যবস্থা। সবকিছু মিলিয়ে এখন যে নাগরিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে তা যথেষ্ট কি—না তা পৌরসভাকেই ভেবে দেখতে হবে। সকলেই একটি সুন্দর—শোভন—পরিচ্ছন্ন শহরের বাসিন্দা হয়ে থাকতে চান। শহরের সড়কবাতিগুলো রাতের বেলা কখনও নিভবে না, সড়কগুলো হবে উন্নত, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা হবে, কোনো জলাবদ্ধতা থাকবে না; এমন ক্যানভাসে সকলেই প্রিয় শহরকে দেখতে চান। আলোচ্য প্রকল্পটি এমন স্বপ্ন—সুন্দর শহর নির্মাণে অনুপম ভূমিকা রাখুক।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন