প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৬
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি আসন্ন দুর্গা পূজা উপলক্ষে রাত ১০ টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। এ জন্য বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি মন্ত্রীকে গত বৃহস্পতিবার চিঠি দিয়েছেন সমিতির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। যে কোনো উৎসবাদি সামনে রেখে দোকানের বেচাবিক্রি কিছুটা বাড়ে। বহু দোকান রয়েছে যেগুলো মূলত বিভিন্ন উৎসবকে সামনে রেখেই পুরো বছর পরিচালনা করা হয়। বিশেষ করে পোশাকের দোকান, জুতোর দোকান, অলঙ্কার ও প্রসাধনির দোকান ইত্যাদিতে ঈদ ও পুজোর সময় বিক্রি বাড়ে। বর্তমানে জ¦ালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি নির্দেশ মোতাবেক রাত ৮ টা পর্যন্ত দোকান ও বিপণিবিতান খোলা রাখা যায়। এর আগে গত এপ্রিল মাসে সন্ধ্যা ৬ টায় দোকান বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। পরে সরকার এই সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত করেন। মাঝখানে সময়সীমার এই বাধ্যবাধকতা কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছিলো। গত ১২ আগস্ট থেকে সরকার আবারও রাত ৮ টার পর দোকান ও বিপণিবিতান বন্ধ করার নির্দেশ জারি করে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ রাখার অর্থনৈতিক প্রভাব কতটুকু বিবেচনা করা হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। তবে দোকান বা বিপণিবিতান বন্ধ রাখা হলে বিদ্যুৎ ব্যবহার কিছুটা কমে তা ঠিক। বিদ্যুৎ বাঁচাতে যদি ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট হয় তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ বলে বিবেচিত হবে না।
নাগরিক জীবন এখন খুব ব্যস্ত। চাকুরি, ব্যবসা অথবা যার যার পেশায় সময় কাটিয়ে দিনের বেলা বাজার করার মতো সময় থাকে না বেশির ভাগ মানুষের। মানুষের ব্যস্ততার কারণে দোকান বা বিপণিবিতান পরিচালনার পরিবেশও বদলে গেছে। এক সময় খুব সকাল বেলা দোকান খোলার রেওয়াজ ছিলো। এখন সকালের প্রথমভাগে কোনো দোকান খোলতে দেখা যায় না। অধিকাংশ দোকান সকাল ১০—১১ টার আগে খোলা হয় না। অর্থাৎ এর আগে বাজারে কোনো ক্রেতা সমাগম ঘটে না। তারপরেও দিনের বেলা খুচরা পণ্য বিক্রির ব্যবসা অনেক সীমিত থাকে। সাধারণত সন্ধ্যার পর যখন মানুষ কাজ শেষ করে একটু সময় পান তখন তাঁরা বাজারে আসেন প্রয়োজনীয় সওদা করতে। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই কেনাকাটার পালা। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দোকান তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যেমন ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন তেমনি ক্রেতাদেরও তাড়াহুড়ো করে দরকারি জিনিস কিনতে হয়। উৎসবের সময়ের কেনাকাটা একটু বিশেষ ধরনের। পরিবারের সকলকে নিয়ে বাজারে আসেন অনেকে। দোকানে দোকানে ঘুরে পছন্দের জিনিস কিনেন। এক দোকান থেকে আরেক দোকান, একটি জিনিস কেনার পর আরেকটি পণ্যের জন্য পৃথক দোকানে যাওয়া; ইত্যাদিতে প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়। সুতরাং দোকান খোলা রাখার সময়সীমা কিছুটা বাড়ানো না হলে যে ক্রেতা—বিক্রেতা উভয়েরই সমস্যা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মনে রাখতে হবে দোকান বা বিপণিবিতানগুলো আমাদের অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের একটি বড় জায়গা। দোকানে চাকুরি করে সংসার চালান অনেক মানুষ। ব্যবসায়ী যদি ভালো ব্যবসা করার সুযোগ না পান তাহলে এই কর্মসংস্থানের জায়গাটি সংকুচিত হতে বাধ্য। সুতরাং ব্যবসায়ী সমিতির দাবি মোতাবেক আসন্ন দুর্গা পূজা উপলক্ষে রাত ১০ টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিবেন বলেই প্রত্যাশিত। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার বিশেষ নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে।
বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে এই সমস্যার সমাধান কখনও সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ এখন জীবনের অপরিহার্য অংশ। প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। ঘরে ঘরে এখন এসি চলে, বিদ্যুৎচালিত উপকরণাদিতে প্রত্যেকের বাসাবাড়ি ভরপুর থাকে। বিদ্যুৎহীন একটি মিনিটও নাগরিকদের কাছে আতঙ্কের নাম। সুতরাং বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে আপাতত এক ধরনের ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাওয়া যৌক্তিক হলেও দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রাপ্তির দিকেই মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। সরকার বিদ্যুৎসংকট মোকাবিলা করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি একটু একটু করে উন্নতিও হচ্ছে। এই উন্নতি দ্রুত এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যখন আর বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত রাখার জন্য নির্দেশ দিতে হবে না। জীবন ও বিদ্যুত— এখন একে অপরের পরিপূরক। জীবনের স্পন্দন, উন্নয়ন ও গতির জন্য বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ তাই একান্ত প্রয়োজন। বিদ্যুতের অবস্থা থেকে একটি দেশের উন্নয়নের পরিমাপ করা সম্ভব হয়। উৎপাদন, অর্থনীতি ও উন্নয়নের জন্য এই মাপকাঠিকে ক্রমশ শক্তিশালী করতে হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন