প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৫৮
হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দিক থেকে সবচাইতে অবহেলিত ও অনুন্নত। এই উপজেলার অধিকাংশ গ্রাম বিচ্ছিন্ন। সড়কপথের যোগাযোগ বঞ্চিত। দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় সরকারি নানা বিভাগের পদায়নে এসব অঞ্চল থাকে সবচাইতে বেশি অবহেলিত। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়, ধর্মপাশা উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদের ৮৩ শতাংশই দুর্গম অঞ্চল বলে বিবেচিত বিদ্যালয়গুলোতে। বৈষম্য এতোই প্রকট যে, দুর্গম গ্রামের শতাধিক শিক্ষার্থীর স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক থাকলেও সুগম গ্রামের ২০ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে রয়েছেন ৫ শিক্ষক। অথচ সরকারি পদসমূহের বৈষম্যহীন পদায়ন প্রত্যাশিত। বলাবাহুল্য অনুন্নত অঞ্চলে নানা কারণে শিক্ষার মান ভীষণ নিম্নগামী। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য সরকার নানামুখী পদক্ষেপের কথা শুনান, কিন্তু বাস্তবে মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শিক্ষা প্রশাসন সর্বত্র শিক্ষকদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন। এক্ষেত্রে প্রভাব, তদবির, যোগাযোগ ও ঘুস লেনদেনের মাধ্যমে সকল শিক্ষকই ভালো যোগাযোগসম্পন্ন বিদ্যালয়ে পোস্টিং নিতে সক্ষম হচ্ছেন। সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে বৈষম্যের চিত্রটি পরিষ্কার। ওই উপজেলায় বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের ৩৭টি এবং সহকারি শিক্ষকের ৮১টি পদ শূন্য। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে শূন্য পদের শতকরা ৮৩ শতাংশই দুর্গম বিদ্যালয়গুলোতে। সুখাইড়, বাখরপুর, পাথারিয়াকান্দা, তেলিগাঁও, খলাপাড়া, সরস্বতীপুর ও মহেশপুর প্রভৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন মাত্র একজন করে সহকারি শিক্ষক কর্মরত আছেন। অথচ এই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যা যথাক্রমে ১৫৫, ১৩২, ৫১, ৫২, ৯১, ১২৯ ও ১৪০ জন। এই সাত বিদ্যালয়ই প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশ ভালো। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার যথার্থ মান বজায় রাখতে আরও অনেক শিক্ষক দরকার। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষক সংকটের এই বাস্তব অবস্থাটি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকদের পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম হননি। এই সাত বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট চিত্রের পাশাপাশি সুগম অঞ্চলে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকদের প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায়। উপজেলার বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ২০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন পাঁচ জন। মাসকান্দায় ৪৫ শিক্ষার্থীর বিপরীত ৫ জন, সুনই কান্দাবাড়িতে ৫৪ শিক্ষার্থীর জন্য ৫ জন, মগুয়ারচরে ৬০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৫ জন, জলিয়ারচরে ৫৪ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৫ জন, দুধবহর জয়তুন্নেছায় ৬০ শিক্ষার্থীর জন্য ৪ জন, কাকিয়াম মৌলভীপাড়ায় ৬৩ শিক্ষার্থীর জন্য ৫ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন বলে ওই সংবাদে উল্লেখ আছে। সবচাইতে আশ্চর্যের বিষয় হলো দুর্গম সরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন একজন সহকারি শিক্ষকও নেই। বিদ্যালয়গুলোর এই বিপরীতমুখী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আনুপাতিক অবস্থা কি সুষম প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষণ ? এই বৈষম্য দূর করতে শিক্ষা প্রশাসনের বাস্তব কোনো উদ্যোগের প্রমাণও দৃশ্যমান নয়।
নতুন নিয়োগে ধর্মপাশা উপজেলায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৪৯ শিক্ষকের মধ্যে গত ১ অক্টোবর ৪৬ শিক্ষক জেলা অফিসে যোগদানপত্র দাখিল করেছেন। এখন নবনিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পদায়নের পালা। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে জানানো হয়েছে লটারির মাধ্যমে এই পদায়নপ্রক্রিয়া সম্পাদন করা হবে। প্রভাব ও তদবির এড়ানোর জন্য লটারি ব্যবস্থা মন্দ নয়। তবে এ ক্ষেত্রে সর্বধিক শিক্ষক সংকটগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলোর কোনটিতে কতোজন শিক্ষক পদায়ন করা হবে সে বিষয়ে শিক্ষা প্রশাসনকে আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই লটারি করতে হবে। যদি দুর্গম এলাকায় এ পর্যায়ে শিক্ষক না দেয়া যায় তাহলে একটি বিশাল অঞ্চলের মানুষ রাষ্ট্রের সহজাত উন্নয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। আমরা জানি, শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বহু তদবির ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হবে। পদায়নকারী কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ নির্মোহ থেকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে এই পদায়ন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। বিষয়টি কেবল ধর্মপাশার ক্ষেত্রে সীমিত নয়। প্রতিটি উপজেলার দুর্গম বিদ্যালয়গুলোরও একই অবস্থা। সুতরাং কোন উপজেলার কোন বিদ্যালয়ে কতোজন শিক্ষক দেয়া হবে আগে তার তালিকা তৈরি করে পরে লটারি করে চূড়ান্ত করার আহ্বান আমাদের। প্রত্যন্ত এলাকা এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় শিক্ষক সংখ্যা নিরূপিত হওয়া আবশ্যক।
সরকারি চাকুরি বদলিযোগ্য। এটি জেনেই সকলে সরকারি চাকুরিতে প্রবেশ করেন। একজন শিক্ষক সারা জীবন বাড়ির কাছাকাছি চাকুরি করবেন এবং আরেকজন সারা জীবন দুর্গম ও দূরবর্তী বিদ্যালয়ে চাকুরি করবেন; এমন বৈষম্য থেকেও শিক্ষা প্রশাসনকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা সবগুলো বিদ্যালয়ে জনবলের ন্যায্য বণ্টন এবং দুর্গম—সুগম অঞ্চলের বৈষম্য দূর হওয়ার বাস্তবতা দেখতে চাই। শিক্ষার্থী অনুপাতে বিদ্যালয়ে কতোজন শিক্ষক দরকার সে বিষয়েও স্পষ্ট অবস্থান দেখার প্রত্যাশা সকলের।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন