গরিব ফেরিওয়ালার উপরও চাঁদার খড়গ

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১৩

শহরের ভ্রাম্যমাণ গরিব ফেরিওয়ালারাও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়। শহরের বড়পাড়ায় এ—রকম চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন জনৈক ভ্রাম্যমাণ ডিম বিক্রেতা। তাঁর কাছে প্রতিটি ডিমের জন্য ১ টাকা হারে চাঁদা দাবি করা হয়। দাবিকারী ব্যক্তি ডিমবিক্রেতাকে ফেরি করে ডিম বিক্রির জন্য তাঁদের নিকট থেকে কার্ড সংগ্রহের জন্য বলেন। কার্ড ছাড়া শহরের কোথাও ঘুরে ঘুরে ডিম বিক্রি করা যাবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি। ডিম বিক্রেতা চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাঁর গায়ে হাত তোলা হয়। চাঁদাদাবিকারী নাকি বলছিল— ‘তারা সরকার থাকি লিজ নিছে।’ হেনস্তার শিকার ওই ডিমের ফেরিওয়ালা প্রতিবেদককে বলেছেন, এর আগেও তিনি জগন্নাথবাড়ি সড়কে জনৈক ডিমের আড়ৎদার কর্তৃক এ—রকম হয়রানির শিকার হন। কোন্ ক্ষমতাবলে ফেরি করে ডিম বিক্রি করা গরিব ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীর নিকট চাঁদা দাবি করা হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে আড়ৎদার হাবিবুর রহমান হাবিব পৌরসভার নিয়মের উল্লেখ করে বলেছেন, ‘পৌরসভার ভিতরে ব্যবসা করতে হলে নিয়ম অনুযায়ী বাৎসরিক ট্যাক্স ও ফিস পরিশোধ করতে হয়’। তিনি গোটা শহরের ডিম বিক্রি তদারকি ও ফেরিওয়ালাদের নিকট থেকে ট্যাক্স বা ফি আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কি—না সে প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ ফেরিওয়ালাদের নিকট থেকে এরকম টাকা আদায় করার কোনো নিয়ম নেই বললেন। সুনামগঞ্জ পৌরসভার সহকারি প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম কয়েস সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, ‘বাইর থেকে এসে পাড়া—মহল্লায় ডিম বিক্রেতাদের কোনো টোকেন নিতে হয় না’। অর্থাৎ জগন্নাথবাড়ির ওই আড়ৎদার পৌরসভার নিয়মের কথা বলে ভ্রাম্যমাণ ডিমের ফেরিওয়ালাদের নিকট অবৈধভাবে চাঁদা দাবি করছেন বলে পরিষ্কার বুঝা যায়। এই ধরনের চাঁদাবাজি ও নিয়মবহির্ভূত অপকর্ম কঠোর হাতে দমন করা উচিৎ। 

 


পৌরসভা থেকে বাজার ইজারা দেয়া হয়। বাজারের ইজারাধীন অংশে বসে যারা অস্থায়ী ব্যবসা পরিচালনা করেন তাঁদের নিয়ম অনুসারে টাকা  (তোলা) দিতে হয়। কিন্তু ফেরিওয়ালারা কোথাও বসে ডিম বিক্রি করেন না। তাঁরা পাড়া—মহল্লায় ঘুরে ঘরে ডিম বিক্রি করে যে যৎসামান্য মুনাফা করেন তা দিয়ে সংসার চালান। ফেরি করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা আমাদের সনাতন বাজার ব্যবস্থার অতি প্রাচীন একটি রীতি। ফেরিওয়ালারা উৎপাদনকারীর নিকট থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয় করে ভোক্তাদের নিকট বিক্রি করে থাকেন। ফলে তাঁরা বাজার সিন্ডিকেটের চাইতে অনেক ক্ষেত্রে কিছু কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। এতে ক্রেতাদেরও কিছুটা সাশ্রয় হয়। এছাড়া হাতের কাছে নির্দিষ্ট পণ্য পেয়ে ক্রেতারাও সন্তুষ্ট হন। কেবল ডিমই নয় বরং সবজি, মাছ, মোরগ, বিভিন্ন ধরনের বাসনপত্রসহ নানা রকম বাহারি পণ্য ফেরি করে বিক্রি করতে দেখা যায়। ফেরিওয়ালা চরিত্রটি আমাদের দেশে সকলের নিকট পরিচিত ও পছন্দনীয়। এই চরিত্রকে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে। আমাদের বাজার সংস্কৃতির সনাতন ও ঐতিহ্যবাহী এই ধারাটিকে যাঁরা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে বিতাড়িত করতে চাইছেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। 

 


সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে এ বিষয়ে আলাদা তদারকি করতে হবে। ফেরিওয়ালারা যাতে অবৈধ হয়রানির শিকার না হন তজ্জন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে বিশেষ প্রচার তৎপরতা চালাতে হবে। ফেরিওয়ালারা সাধারণত একেবারেই গরিব। তাঁরা সমাজের নির্বিরোধ চরিত্রের মানুষ। এরা অত্যাচারিত হলেও মুখ ফুটে প্রতিবাদ করার সাহস রাখেন না। অথচ এরা এই রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তাঁরা কায়ক্লেশে একটা কিছু করে জীবন চালানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের এই জীবিকাকে রক্ষা করতে হবে। নতুবা এরা পেশা থেকে বিতাড়িত হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝায় পরিণত হবে। ব্যক্তিবিশেষকে (এক্ষেত্রে ডিমের আড়ৎদার) সরকারের বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দায়িত্ব পালন এবং অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেয়া অনুচিত, এরকম কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারীদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ফেরিওয়ালারা অভিযোগ করুক বা নাই করুক যেহেতু গণমাধ্যমের বদৌলতে অন্তত একটি অপকর্মের সংবাদ পাওয়া গেছে; সেহেতু ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পৌরসভার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। পাড়া—মহল্লায় যাঁরা ফেরি করে পণ্য বিক্রি করেন তাঁদেরও সচেতন থাকতে হবে। অনুরূপ হেনস্তার সম্মুখীন হলে পৌরসভা কিংবা সুনামগঞ্জ সদর থানা কর্তৃপক্ষকে তা জানানো উচিৎ।  আমরা আশা করবো এখন থেকে  সুনামগঞ্জ শহরের কোনো পাড়া—মহল্লায় ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালারা আর কারও দ্বারা চাঁদাবাজির শিকার হবেন না, তাঁদের অহেতুক মারধর করাও বন্ধ হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার