প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:২১
বৈশি^ক জলবায়ুগত পরিবর্তন কয়েক দশক ধরে দৃশ্যমান। এ বছর বাংলাদেশে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ বছর হাওরগুলোতে পানি কম থাকায় বোরো চাষাবাদ মৌসুমের আগেই বিভিন্ন হাওর শুকিয়ে যাচ্ছে। সঠিক সময়ের আগে বোরো ধানের চারা রোপণ করলে কাম্য উৎপাদন পাওয়া যাবে না। ফলে যে—সব হাওর থেকে দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে সেই—সব হাওরের কৃষকরা ভীষণ দুশ্চিন্তায়। তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওর এর অন্যতম। এই হাওর থেকে পানি নেমে যাচ্ছে। সাধারণত ১৫ নভেম্বরের পর মাটিয়ান হাওরে বোরো ধানের চারা রোপণ করা হয়। আগে হাওর শুকিয়ে যাওয়ায় দুই সপ্তাহ আগে চারা রোপণের অবস্থা তৈরি হয়েছে এই হাওরে। ফসল উৎপাদনে ঝঁুকি তৈরির আশঙ্কায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কৃষকরা মাটিয়ান হাওরে যাতে আরও কিছু দিন পানি থাকে সে—জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে মাটিয়ান হাওর উন্নয়ন কমিটির সদস্যরা প্রশাসনের দ্বারস্ত হন। কৃষকদের আশঙ্কা আমলে নিয়ে উপজেলা প্রশাসন মাটিয়ান হাওরের নান্দিয়া খালের মুখ বাঁধ দিয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করে। এতে হাওরের পানি শুকানো কিছুটা বিলম্বিত হবে। কৃষকরা যথাসময়ে ধানের চারা রোপণের সুযোগ পাবেন। এ জন্য তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ থেকে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। হাওর উন্নয়ন কমিটির সদস্যরা বাঁধের কাজ শুরু করেছেন। ৩৬০ ফুট দৈর্ঘের এই বাঁধটি নির্মাণ দ্রুত শেষ করতে পারলে মাটিয়ান হাওরে বোরো চাষাবাদ উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে। উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থের উপযোগী একটি সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকরী করায় তাঁদের অভিনন্দন। কৃষি বাংলাদেশের প্রাণ। বলা যেতে পারে কৃষিই বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। কৃষি ও কৃষক টিকে থাকলে বাংলাদেশের বহু ঝঁুকি কমে যায়। তাই কৃষির স্বার্থে সব ধরনের উদ্যোগ প্রত্যাশিত। সরকার এ জন্য বরাদ্দ প্রদানে কার্পণ্য করে না। কিন্তু মাঠে বাস্তবায়ন পর্যায়ে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, কালক্ষেপণ ও দুর্নীতির কারণে এই বরাদ্দ অনেকাংশেই অপচয়ে পরিণত হয়। তবে এই মুহূর্তে আনন্দের খবর হলো, অতি সামান্য বরাদ্দ দিয়ে বিশাল মাটিয়ান হাওরের কৃষিজ পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ। এই ধরনের কৃষিবান্ধব কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ ও ধারাবাহিকতা কাম্য।
কেবল তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওর নয়, জেলার বহু হাওরে এ—রকম আগাম পানি নেমে যাওয়ার বাস্তবতা বিদ্যমান। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সকল হাওরের প্রতি সুতীক্ষè নজর রাখতে হবে। বোরো ধান চাষ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মের আওতায় পরিচালিত হয়। সময়ের হেরফের হলে দুর্যোগে পড়ে উৎপাদনচক্র। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হবে। আগেভাগেই এসব সমস্যা চিহ্নিত করে তাদের যথাবিহীত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ ছিলো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কৃষি বিভাগের এ ধরনের সচেতন উদ্যোগ খুব কম। আমাদের দুর্ভাগ্য দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যার যে দায়িত্ব তা তারা যথাযথভাবে পালন করেন না। বিশেষ করে কাজের ক্ষেত্রে তাঁদের আন্তরিকতা প্রত্যাশিত মাত্রার থাকে না। আর কিছুদিন পর হাওরকে অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণের কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। এ জন্য প্রাথমিকভাবে প্রকল্প নির্বাচন, প্রাক্কলন তৈরি, স্থানীয়ভাবে সকল কৃষকের সাথে মাঠসভার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন, কাজ শুরু, কাজের মান তদারকি এবং সঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে হবে। প্রতি বছরই এইসব কাজে আমরা প্রচুর ঘাটতি লক্ষ্য করি। বিশেষ করে পিআইসি গঠনে স্থানীয় কৃষকদের চাহিদাকে অগ্রাহ্য করে বিভিন্নভাবে প্রভাবশালীদের দ্বারা পিআইসি গঠনের দুঃখজনক বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করা যায়। এ বছর যাতে বিগত বছরগুলোর মন্দ উপসর্গ দ্বারা আক্রান্ত না হয় সে দিকে এখন থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ফসলরক্ষা বাঁধ উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটিকে এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমরা চাই না সরকারের টাকা কতিপয় সুবিধাভোগীর পকেটে ঢুকে লক্ষ কৃষকের স্বপ্নের অকাল মৃত্যু ঘটাক।
ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার দিকটিও কৃষকদের আরেক বড় সমস্যা। হাওরে ধানের বিশাল দরপতনের নির্মম অবস্থা চলছে। কৃষকরা দাম না পেয়ে দিশেহারা। কেবল ধান নয়, কৃষকরা যে—সব কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন তার সবগুলোতেই একই অবস্থা দেখা যায়। কৃষক যদি উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন তাহলে শেষ পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয় দেশের কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থা। তাই কৃষকদের সব ধরনের সমস্যা সমাধানকে সরকারের অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন