বালুর লোভে জমি গ্রাস

প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২০:৪৯

বর্তমান সময়ে সুনামগঞ্জ জেলার অর্থনৈতিক মুনাফা লাভের অন্যতম উৎস প্রাকৃতিক সম্পদ বালু। যে স্থানে বালু আছে সেইসব স্থান এখন হয়ে উঠেছে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অর্থলিপ্সা মিটানোর অভয়ারণ্য। যে যেভাবে পারে সেভাবেই বালু আহরণ করে টাকার পাহাড় তৈরি করতে ব্যস্ত। এখানে বৈধতা—অবৈধতার প্রশ্ন নেই, আইন—কানুনের তোয়াক্কা নেই, নিয়ম—নীতির বালাই নেই। এখন শুরু হয়েছে অন্যের জমি দখল করে বালু তুলার দস্যুতা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদীর পাড়ে থাকা জনৈক কৃষকের এক খণ্ড জমি দখলে নিতে একটি গোষ্ঠী রীতিমতো দস্যুতা শুরু করেছে। মরাচেলা নদী দিয়ে পাহাড় থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বালু নেমে আসে। এই বালু নদী তীরবর্তী জমিতেও জমা হয়। পূর্ব চাইরগাঁও গ্রামের কামাল উদ্দিনের একখণ্ড জমি আছে মরাচেলা নদীর পাড়ে। তিনি সেখানে বসতঘর নির্মাণ করে অবশিষ্ট জমিতে কৃষিকাজ করেন। এই জমি ও কৃষিকর্ম নিয়ে সুখের সংসার কামাল উদ্দিনের। এখন সুখের এই জমির প্রতি লোভের অগ্নিদৃষ্টি পড়েছে বালুখেকোদের। তারা কামাল উদ্দিনের জমিতে সঞ্চিত বালু তোলার জন্য মরিয়া। বালু তুলে নদীতীরবর্তী এই স্থানটিকে ডাম্পিংস্টেশন হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সংবাদতথ্য অনুসারে শফিক মিয়া নামের এক ব্যক্তি সহযোগীসহ কয়েক মাস আগে কামাল উদ্দিনের ওই জমি থেকে বালু তুলতে চাইলে মালিক বাধা দেন। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশ হয়। দ্বিতীয় দফা সালিশের তারিখ নির্ধারিত হয়েছিলো।  দখলকারীরা ওই বৈঠকের জন্য অপেক্ষা না করেই গত ৪ নভেম্বর লোকজন নিয়ে বর্ণিত জমি দখল করতে যান। লাঠিসোঁটা নিয়ে আব্দুল বারীর জমির চারদিকে খঁুটি গাঁড়েন। পরদিন (৫ নভেম্বর) জমির ফলন্ত ফসল নষ্ট করে আসে দখলকারীরা। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেছেন। দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরেজমিন পরিদর্শন করে ফসল নষ্ট করার সত্যতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের খবরকে। উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) বিষয়টিকে অমানবিক ও দুঃখজনক উল্লেখ করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ^াস দিয়েছেন। 

 


বালু আহরণের উদ্দেশ্যে যারা কামাল উদ্দিনের জমি দখল করতে গিয়েছিলেন, নিঃসন্দেহে তারা অতিশয় শক্তিমান ও প্রভাবশালী। প্রভাব—প্রতিপত্তি না থাকলে ইজারাবহির্ভূত এলাকা থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ বালু অবেধভাবে উত্তোলন ও অন্যের জমি জোর করে দখল করার চেষ্টা করতে পারতেন না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কারও ওই ধরনের প্রভাব তৈরি হয় না। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের রাজনীতিকদের একটি অংশ এইসব দুর্বৃত্তদের সরাসরি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কখনও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। তাঁরাও বন্ধু ভাবাপন্ন থাকেন বলেই সকলের অভিমত। তাই যেখানে যত দুষ্কর্ম সম্পাদিত হয় সর্বত্রই আমরা প্রভাবশালীদের জয়—জয়কার ও দুর্বলের অত্যাচারিত হওয়ার দৃশ্য দেখে আসছি। আইনের ভুল ব্যা্খ্যা দিয়ে, সুক্ষ্ম ফাঁক গলিয়ে, দায়িত্বশীলদের বশীভূত করে এবং টাকার খেলা দেখিয়ে জেলার বালুমহালগুলোতে নির্বিচারে লুটপাট ও পরিবেশ—প্রতিবেশ ধ্বংস করার প্রবণতা প্রতিনিয়ত আমরা দেখে আসছি। এই অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিকার ব্যবস্থা কেবল লোক দেখানো এবং নামমাত্র। এ—সব ব্যবস্থা কখনও দুর্বৃত্তপনা ঠেকাতে পারে না। বালু—পাথর লুটেরারা প্রশাসনিক অভিযানের খবর পেয়ে যায় আগে—ভাগেই। আভিযানিক দল গিয়ে শান্ত ও নিঃস্তরঙ্গ শূন্য নদী দেখে ফিরে আসে। আগেভাগে অভিযানের খবর চাউর হয়ে যায় কী করে, সেই জাদুভরা রহস্যময় প্রশ্নের উত্তর মেলানো খুব কঠিন। বুঝা অসম্ভব নয়, দোয়ারাবাজার উপজেলার মরাচেলা নদী ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে একই ধরনের দুর্বৃত্তপনা স্বমহিমায় পরিচালিত হচ্ছে। এখানে লুণ্ঠনের শিকার একজন কামাল উদ্দিনের সহায়—সম্পদ হারানোর কষ্ট হয়তো বিশাল বালুর স্তূপের নীচে চাপা পড়ে যাবে অবলীলায়। 

 


এই রকমেই কি সবলের হাতে দুর্বলের পীড়ন হতেই থাকবে ? সকলেই চেয়ে চেয়ে দেখবেন ? মরাচেলা নদীর যত্রতত্র এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলে কোন্ বৈধতাবলে বালুখেকোদের নির্বিচার আগ্রাসন চলছে তা দেখার কি কেউ নেই ? এইসব প্রশ্ন সকলের মনে নিত্য ঘুরে বেড়ায়। সাধারণ মানুষ সেই উত্তর মেলাতে পারে না। কেবল নীতিহীনতার দাপুটে আস্ফালন দেখে দীর্ঘশ^াস ছাড়ে। এই দীর্ঘশ^াস এখন আমাদের চারপাশের বাতাসকে অতিশয় ভারী করে তুলেছে। মরাচেলা নদী তীরের কামাল উদ্দিনের জমি হারানো ও ফসল নষ্ট করার অপপ্রয়াস কোন্ গতিপ্রাপ্ত হয় তা দেখতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার