প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৫
সুনামগঞ্জে বোরো ধানের বিশাল দরপতন নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা গত কয়েক মাসের নিদারুণ বাস্তবতা। একটু দাম চড়লে বিক্রি করবেন বলে যে কৃষকরা ধান মজুদ করে রেখেছিলেন তাদের এখন মাথায় হাত পড়েছে। অন্যান্য বছর যখন এই সময়ে প্রতি মণ ধান দেড় হাজার থেকে ষোল শ’ টাকায় বিক্রি হতো সেই ধানের দাম এ বছর নেমে এসেছে ৯০০ থেকে এক হাজার দুইশত টাকায়।
বোরো মৌসুমে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে ধানের রঙ ও মান খারাপ, এই অজুহাতকে সামনে এনে পাইকারি ধান ক্রেতারা কৃষকদের পানির দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য করছে। উপায়ন্তর না পেয়ে এই শেষ মৌসুমে এসে বহু লোকসান দিয়ে কৃষকরা ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ধানের এই দরপতনের বিষয়টি এর আগেও গণমাধ্যমের বদৌলতে জনসমক্ষে এসেছে। কিন্তু টনক নড়েনি সরকার বা প্রশাসনযন্ত্রের। কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য পাইয়ে দিতে সরকারের উদ্যোগহীনতা সংকটকে আরও বড় করেছে। এখন যে দামে কৃষকরা ধান বিক্রি করছেন তা উৎপাদন খরচের চাইতেও কম। এক মণ বোরো ধান উৎপাদনে এক হাজার এক শ’ থেকে এক হাজার চার শ’ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে থাকে। কৃষকের নিজের শ্রমমূল্য নেই এই হিসাবে। দেখা যাচ্ছে মণপ্রতি পাঁচ শ’ টাকা করে লোকসান দিতে হচ্ছে কৃষককে। আমাদের প্রান্তিক কৃষকদের এই লোকসান সহ্য করার কোনো সাধ্য আছে ? বাংলাদেশে ধান বিক্রির প্রধান নিয়ন্ত্রক বেসরকারি ব্যবসায়িক খাত। সরকারিভাবে অতিসামান্য পরিমাণ ধান ক্রয় করা হয় যা উৎপাদিত ধানের কোনো শতাংশের মধ্যেই পড়ে না। বরং ধানের চাইতে কয়েক গুণ বেশি চাল কেনা হয় মিল—মালিকদের মাধ্যমে। ফলে সরকারি চাল ক্রয়ের কোনো সুফল কৃষকরা পান না। এ বছর জলবায়ুর আচরণগত পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের সরকারি উদাসীনতায় হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার কারণে হাওরের কিছু অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, যত্রতত্র সড়ক ও অবকাঠামো তৈরিসহ হাওর রক্ষণে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে হাওর থেকে বৃষ্টির পানি নামার কোনো রাস্তা না থাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে বহু কৃষকের উৎপাদিত ধান যেমন জমিতে নষ্ট হয়েছে, কিছু কাটা ধান খলায় পচে নষ্ট হয়েছে তেমনি জমির অপরিপক্ক ধান কাটতেও বাধ্য হয়েছেন কৃষক। এর ফলে এ বছর কিছু ধানের রঙ ও মান নষ্ট হয়েছে। তবে ঢালাওভাবে হাওরের সকল ধানের মান খারাপ, এমন বলার অবস্থা নয়। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে ফসলের এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দায় মিটাতে হচ্ছে উৎপাদনকারী কৃষক সমাজকে। খাদ্য নিরাপত্তার মূল খঁুটি এই কৃষকদের বিশাল লোকসানের মুখে ঠেলে দিয়ে আসলে দেশ ও জাতির কোন্ লাভ হবে ?
প্রচলিত নিয়মে ধানের দাম কমলে চালের দামও কমার কথা। কিন্তু বাজারে কি চালের দাম কমেছে ? সুনামগঞ্জের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, ‘ধানের দাম কমলেও সেই অনুপাতে চালের দাম কমেনি’। বুঝা যায় ধানের দরপতনের পিছনে লুটেরা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ভূমিকা আছে। দেশের কোনো ব্যবস্থাই এই বাজার সিন্ডিকেটকে রুখতে পারেনি। ধানের মতো খাদ্যনিরাপত্তার অপরিহার্য পণ্যের বাজারজাত বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারি উদ্যোগ অতিশয় নগন্য। এখানে কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য পাইয়ে দিতে তেমন কোনো কাঠামোগত পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। অথচ এই জায়গায় সবিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিলো। ধান উৎপাদন করে যদি বছর বছর কৃষকদের লোকসান গুণতে হয় তাহলে কৃষকরা কি এই জায়গা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন না ? তখন কি ভয়ঙ্কর বিপর্যয় দেশে নেমে আসবে তা কি কখনও কেউ চিন্তা করে দেখেছেন ? বিশ^ এখন অত্যন্ত অস্থিতিশীল, মন্দাক্রান্ত এবং যুদ্ধের হুমকির মুখে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বয়ম্ভরতাই টিকে থাকার একমাত্র উপায়। কৃষিতে আমাদের মোটামুটি স্বয়ম্ভরতা অর্জন হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু অবহেলা ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে সেই কৃষি আজ মহাবিপর্যয়ের মুখে।
আগামী বোরো মৌসুমের চাষাবাদের জন্য কৃষকদের এখন প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। হাওরাঞ্চলে ধানের নজিরবিহীন দরপতনের বিষয়টি জরুরিভিত্তিতে সরকারের বিবেচনায় নিতে হবে। কৃষকের ক্ষতি কী উপায়ে কমানো যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একইসাথে আগামী মৌসুমে বছরব্যাপী যাতে কৃষকরা সরকারি ভাণ্ডারে ধান বিক্রি করতে পারেন সেজন্য একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করার অনুরোধ আমাদের। কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে না পারলে বাংলাদেশের ভীষণ বিপদ হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন