রথযাত্রা: ভক্তের দুয়ারে জগন্নাথ

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬ ১৮:৪৫

রথযাত্রা মহোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আষাঢ় মাসের পুষ্যা নক্ষত্রযুক্ত শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে এ মহোৎসবের সূচনা হয় এবং শুক্লা একাদশী তিথিতে পুনর্যাত্রা বা উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে।


লোকপ্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এ সময় ভগবান শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলদেব ও দেবী সুভদ্রা রথে আরোহন করে নীলাচল থেকে সুন্দরাচলে, অর্থাৎ মাসির বাড়িতে গমন করেন। সেখানে নয় দিন অবস্থানের পর পুনরায় নীলাচলে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে শাস্ত্রের আলোকে রথযাত্রার প্রকৃত তাৎপর্য কেবল মাসির বাড়ি ভ্রমণ নয়; এর অন্তরালে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক রহস্য।


ভগবান শ্রীজগন্নাথদেবকে সর্বাধিক কৃপাময় রূপে বর্ণনা করা হয়। তিনি অল্প সেবাতেই সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর শ্রীবিগ্রহের সেবাও তুলনামূলকভাবে সহজ। শ্রীমন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে রথে আরোহণ করে জনসমাগমের মাঝে আগমনের মূল উদ্দেশ্য হলো সকল ভক্তকে দর্শনদান করা। এমন অনেক ভক্ত আছেন, যারা অসুস্থতা, বার্ধক্য, সময় কিংবা আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে মন্দিরে গিয়ে ভগবানের দর্শন করতে পারেন না। তাঁদের প্রতিই বিশেষ কৃপা প্রদর্শনের জন্য ভগবান জগন্নাথ বড়ভাই শ্রীবলদেব ও ছোটবোন দেবী সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই ভক্তদের কাছে চলে আসেন।


সূতসংহিতায় বলা হয়েছে— “রথে চ বামনং দৃষ্টবা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।” অর্থাৎ, রথে বিরাজমান ভগবান শ্রীজগন্নাথকে দর্শন করলে জীব পাপমুক্ত হয় এবং পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের যোগ্যতা অর্জন করে।


শাস্ত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, যে ব্যক্তি ভগবান শ্রীজগন্নাথের রথের রশি টানেন, তাঁর পাপ, দুঃখ ও কষ্ট ভগবান নিজের কৃপায় দূর করে দেন। স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে, রথের রশি টানলে অশ্বমেধ যজ্ঞের সমতুল্য পুণ্য লাভ হয়। কেউ যদি রশি টানতে না পারেন, কেবল স্পর্শ করেন, তবুও বিশেষ পুণ্য লাভ করেন। আর যদি কোনো অসামর্থ্য ব্যক্তি রশি স্পর্শ করতেও না পারেন, কিন্তু একবার আন্তরিকভাবে রথারূঢ় ভগবান শ্রীজগন্নাথকে দর্শন করেন, তবে তিনি গঙ্গাস্নানের সমতুল্য পুণ্য লাভ করেন।


এ কারণেই বলা হয়, অন্যান্য দেববিগ্রহের ক্ষেত্রে যেখানে পূজা—অর্চনার মাধ্যমে বিশেষ পুণ্য লাভ হয়, সেখানে ভগবান শ্রীজগন্নাথের ক্ষেত্রে আন্তরিক দর্শনই মহাপুণ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই তিনি তাঁর অসীম করুণা ও দয়ার পরিচয় প্রদান করেন।


শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলদেব ও দেবী সুভদ্রার এই রথযাত্রা মহোৎসব ‘পাণ্ডুবিজয়’ নামেও পরিচিত। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে দ্রাবিড় দেশের দক্ষিণ প্রান্তে পাণ্ড্য নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁর পুরোহিত দেবেশ্বর ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত। পুরোহিতের উপদেশে রাজা জগন্নাথদেবের সেবা—পূজার পুনঃপ্রবর্তন করেন। ভবিষ্য পুরাণে উল্লেখ রয়েছে, সত্যযুগে প্রহ্লাদ মহারাজ সর্বপ্রথম মহাবিষ্ণুর রথ টেনেছিলেন। আবার স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী, সত্যযুগে মালব দেশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন মহারাজপ্রথম ভগবান শ্রীজগন্নাথের দারুব্রহ্ম বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান রথযাত্রায় যে বিগ্রহ ব্যবহৃত হয়, তা সেই দারুব্রহ্ম—তত্ত্বেরই ধারক ও বাহক।


রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ভগবানের অসীম দয়া, সর্বজনীন প্রেম ও সকল জীবের মুক্তির আহবানের প্রতীক। এই মহোৎসব আমাদের শিক্ষা দেয়—ভগবান কখনো ভক্তের দূরত্ব মেনে নেন না; বরং তিনি নিজেই ভক্তের দুয়ারে এসে কৃপাধারা বর্ষণ করেন। তাই রথযাত্রা আমাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, ভক্তি, করুণা ও আত্মশুদ্ধির এক মহাসুযোগ।


লেখক : কলাম লেখক, সিলেট।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার