টিভিতে বিশ্বকাপ ফুটবল ১৯৮২ - ২০২৬

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৯:১০

পর্ব - ৩০
১৫ জুলাই, ২০২৬ সাল। টরন্টো কানাডার আবহাওয়া গুমোট। তাপমাত্রা ফিলস লাইক ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আকাশে ধোঁয়াশা। ড্যাবলা ভাব। টরন্টো টাইম বেলা ৩ টায় ২য় সেমিফাইনাল ম্যাচ - আর্জেন্টিনা vs ইংল্যান্ড। আটলান্টা স্টেডিয়াম। সেখানে আসন সংখ্যা মোট ৬৮, ২৩৯ টি ( আটষট্টি হাজার দুইশত উনচল্লিশ )। গ্যালারি হাউসফুল। দুই দলে শেষ দেখা হয়েছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। তখন ২-১ গোলে আর্জেন্টিনা হারিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। সেই খেলায় ঈশ্বর সহায় ছিলেন আর্জেন্টিনার পক্ষে। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের বিপক্ষে আজকে মেসির প্রথম খেলা। মেসি কি আজকে বাঁ পায়ে যাদু দেখাতে পারবেন? কিংবা অন্য কেউ কোন ভেল্কি? খেলা শুরু হয়ে যায়। মিনিট দশেক খেলা থেকে বুঝা যায় ইংল্যান্ড খেলছে চাপ মুক্ত হয়ে আর আর্জেন্টিনা খেলছে মাথায় অনেক চাপ নিয়ে। পাল্টাপাল্টি আক্রমণ চললেও খেলায় যেন প্রাণ নেই। বল একটু বেশি ইংল্যান্ড দখলে থাকলেও টার্গেটে শট নিচ্ছে আর্জেন্টিনা বেশি। ৩৬ তম মিনিটে মেসি মাত্র দুজনকে কাটিয়ে তিন নং কে কাটাতে যাবেন তখনই ফাউল। মেসির উপর যত ফাউল হয়েছে আর সব মোট প্লেয়ারদের উপরও ততটি হয়নি। তাই মেসি সিদ্ধান্ত নেন নিজে গোল না করে গোলের যোগানদার হবেন। ৩৯ মিনিটের সময়ে আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকারের অনেক দূর পাল্লার শট ইংলিশ বারের সামান্য উপর দিয়ে চলে যায়। ০-০ চলে হাফ টাইম পর্যন্ত। হাফ টাইমের পর দুই দলই আক্রমণে নামে। খেলার গতি ও সৌন্দর্য বেড়ে যায়। ৪৭ তম মিনিটে আর্জেন্টাইন দুটি শট পরপর ব্যর্থ হয়। ঠিক ৫৫ মিনিটের মাথায় মাঠ স্তব্ধ করে ইংলিশ গোল। হঠাৎ যেন আর্জেন্টিনার মাথায় বাজ পড়ল। মেসির বেজার মুখ পর্দায় ভাসে। আক্রমণের শুরুটা হয় একেবারে ইংল্যান্ড প্রান্ত থেকে। দূর পাল্লার শট থেকে আর্জেন্টিনা সীমানায় বল রিসিভ করেন ইংলিশ জার্সি নং ১৭ মর্গান রজার্স ( Morgan Rogers )। তিনি বল নিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গেলে আর্জেন্টাইন ডিফেন্সর দুয়ার যেন উন্মুক্ত হয়ে যায় নিমেষে। মর্গান রজার্স দৌড়ের মধ্যেই ক্রস পাস দেন সতীর্থ ১৮ নং জার্সি এন্থনি গর্ডনকে ( Anthony Gordon )। এবার গর্ডনের নিখুঁত শটে চোখ ধাঁধানো গোল। আর্জেন্টাইন কিপার কিছু বুঝার আগেই বল জালে। ইংলিশ কোচ ও সমর্থকদের উল্লাস আর থামতে চায় না। আগে গোল খেয়ে পরে ম্যাচ জেতা আর্জেন্টিনার অভ্যাস আছে। তবে আজকের ব্যাপার আলাদা। ১ গোল খেয়ে আর্জেন্টিনা গুলি খাওয়া বাঘের মতো প্রবল প্রতাপে পাল্টা আক্রমণ চালাতে থাকে। খেলা চলে গেছে এবার আর্জেন্টিনার হাতে। ইংলিশরা ডিফেন্সে। একের পর এক আর্জেন্টাইন ঝড় সামলাতে ব্যস্ত ইংল্যান্ড।

তাদের গোলকিপার অসাধারণ সব সেভ করে যাচ্ছেন। ৮৫ মিনিটের মাথায় আর্জেন্টাইন গোল পরিশোধ। চোখের পলক পড়তে না পড়তেই নিমেষেই ঘটে যায় ঘটনাটি। মেসির বাড়ানো পাস থেকে আর্জেন্টাইন জার্সি নং ২৪ এঞ্জো ফার্নান্দেজ ( Enzo Fernandez ) বক্সের বাইরে থেকে পাওয়ারফুল লং রেঞ্জ শটে ইংলিশ গোলকিপার জর্ডন পিকফোর্ডকে হতচকিত করে দিয়ে বল জালে ঢুকিয়ে দেন। ইংলিশ কিপার ক্ষোভে মাটি চাপড়াতে থাকেন। ১-১। খেলা একেবারে টপ গিয়ারে চলছে। কখন কি হয় বলা যায় না। অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে না পেনাল্টি শুট আউটে নিষ্পত্তি হবে না আগেই ফয়সালা হয়ে যাবে! শেষ হুইসেল না বাজা পর্যন্ত মেসিকে বিশ্বাস করা যায় না। অবশেষে সেটাই ঘটল ৯০+ ০২ মিনিটের সময়ে বা স্টপেজ টাইমে। এই গোল গুলো হওয়ার সময় কিছুই ভালো করে বুঝা যায় না। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে ঘটে যায় ঘটনা। রিপ্লে না দেখলে বুঝার উপায় নেই কিভাবে কি হলো। ইংলিশ গোলপোস্টে মেসির উড়ন্ত নিখুঁত পাস। সেখান থেকে আর্জেন্টাইন জার্সি নং ২২, লাওতারো মার্টিনেজ (Lautaro Martinez ) দুরন্ত হেডে গোল করলে সবাই চমকিত ও আশ্চর্যান্বিত হয়ে যান। মাঠে ও গ্যালারিতে আনন্দের তরঙ্গমালা উঠছে আর নামছে। খেলার বাকি কয়েক মিনিট আর্জেন্টিনা লং শটে পার করে দেয়। তারপরের আর্জেন্টাইন উল্লাস তো সবাই দেখেছেন। জয়সূচক গোলের হেডদাতা মার্টিনেজকে বারবার দেখানো হচ্ছে। তিনি কাঁদছিলেন। মনে হয় মেসিকে উৎসর্গ করে দিচ্ছেন সব কৃতিত্ব। অন্যান্য সব দলেই ভালো ভালো প্লেয়ার আছেন। কিন্তু যাদুকর একমাত্র মেসি। ইংল্যান্ড জয় পেয়েও ধরে রাখতে পারল না। আর আর্জেন্টিনা সেই জয়টা কেড়ে নিয়ে ফাইনালে একটানা দ্বিতীয় বারের মতো উঠে গেল। এবারও ইংল্যান্ড ২-১ গোলে আর্জেন্টিনার কাছে পরাজিত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। এদিকে মেসি ছাড়িয়ে গেলেন গুরু ম্যারাডোনাকে।


ফ্ল্যাশব্যাক - ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ফকল্যাণ্ড দ্বীপ নিয়ে যুদ্ধ হয়েছিল। ইংল্যান্ডের একটি আধুনিক ফ্রিগেট গভীর সমুদ্রে আর্জেন্টাইন ভূখণ্ড থেকে প্রায় তিনশত নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল। আর্জেন্টাইন যুদ্ধ বিমান মিসাইল নিক্ষেপ করে সেটি সাগরে ডুবিয়ে দেয়। তখন বিশ্বে শোরগোল উঠে। ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টার শক্ত মানবী মার্গারেট থ্যাচার পার্লামেন্টে বক্তব্য দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ও কঠোর প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। সবাই অবাক হন যে আর্জেন্টিনা এত আধুনিক প্রযুক্তি কোথায় পেল? বন্ধু দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন / রাশিয়ার দিকে সন্দেহের আঙ্গুল তুলে। তারা নাকি স্যাটেলাইট থেকে সবকিছু ঠিকঠাক করে দিয়েছে। হতে পারে নাও হতে পারে। সেই ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট জেমস বন্ডের আমল থেকেই ত শত্রুতা চলে আসছে। এদিকে মার্গারেট থ্যাচার সৈন্য ও গোলাবারুদ ভর্তি নৌ জাহাজ পাঠান আর্জেন্টিনার উদ্দেশ্যে। বিটিভি প্রতিদিন সেই জাহাজের অগ্রগতি দেখাতো নিউজ টাইমে। খোলা সাগরে জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে। সৈনিকরা খোলা ডেকে ব্যায়াম করছেন। খাবার গ্রহণ করছেন। অস্ত্রশস্ত্র পরিষ্কার করছেন। প্রায় দুই সপ্তাহ লেগেছিল জাহাজ ফকল্যাণ্ডে পৌঁছাতে। সামরিক যুদ্ধে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়েছিল ইংল্যান্ডের কাছে।
এখানেই শেষ করছি। আর দুটি পর্ব বাকি আছে।


লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার