প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ১০:৪৫
গুণিজন স্মরণ
না, আমি কোন সংঘাত চাই না। ওরা এখন বুঝতেছে না। এখানে অনেকেই আমার সন্তান সমতুল্য, অনেকে দীর্ঘদিনের সাথী। নিশ্চয়ই কোন এক দিন নিজেদের ভুল তারা বুঝতে পারবে। তোমরা আনন্দ করতে গিয়ে আবার নতুন কোন ঝামেলায় জড়াও সেটা আমি চাই না। সুতরাং মিছিল করা যাবে না। অসমাপ্ত কাউন্সিণ অধিবেশ শেষে নতুন কমিটিকে নিয়ে একটি মিছিল করা যায় কী—না জানতে চেয়েছিলাম বদি ভাইয়ের কাছে। উত্তরে এমনটিই বলছিলেন তিনি।
আকেটি প্রশ্ন করেছিলাম বদি ভাইকে। ভাই আপনি কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখেন ?
তিনি স্বভাব সুলভ ভঙ্গিমায় বললেন, আমি জানি তুমি কি জানতে চাইছো। আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি এদের নোংরামী দেখে। তখন কয়েক জনের নাম উল্লেখ করে বললেন, এরা আমাকে নিয়ে আজেবাজে কথা লিখবে কখনো ভাবিনি। তবে আমি সংগঠনের অনেক সিনিয়রদের বলেছি, প্রাক্তণদের বলেছি এবং পার্টির নীতি নিধার্রণী ফোরামের অনেক নেতাদেরও বলেছি ওদের বলতে অসমাপ্ত কাউন্সিল অধিবেশনে যোগ দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেনো তারা নতুন কমিটি নিবার্চন করে। আমি কোন পক্ষে যাবো না। কিন্তু তারা আমার কথায় কর্ণপাত করেনি। উল্টো আমাকে দোষারোপ করছে। ওরা আমাকে জোর করে তাদের পক্ষে কথা বলাতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমি বলিনি। এতেই তাদের সকল ক্ষোভ । মনে কিছু কষ্ট থাকলেও এতেই আমি খুশি যে তোমাদের সকলের সহযোগিতায় অসমাপ্ত সম্মেলনটি আজ আমি সম্পন্ন করতে পেরেছি। আমার উপর দেয়া অর্পিত গুরু দায়িত্ব আজ শেষ হলো। ২০২৫ সনের ২০ জুন সন্ধ্যায় মতিঝিলে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা মিলানায়তনে অসমাপ্ত কাউন্সিল অধিবেশনের ভোট গ্রহণ শেষে যখন ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষা করছি ঠিক তখন আমার এই কথাগুলো হচ্ছিলো অধ্যাপক বদিউর রহমানের সাথে।
অধ্যাপক বদিউর রহমানকে আমি চিনি ২০০৬ সালে। তখন আমি সুনামগঞ্জ জেলা উদীচীর সদস্য সচিব এবং উদীচীর জাতীয় পরিষদ সদস্য। অধ্যাপক যতীন সরকার কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং মাহমুদ সেলিম সাধারণ সম্পাদক। বদি ভাই তখন কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি। অধ্যাপক বদিউর রহমান এবং ডা. চন্দন দাশ এই দু’জন সহসভাপতি যেনো মানিক জোড়। যেকোন সভায় যুক্তি—তর্কে—বিশ্লেষণে অসাধারণ। ২০০৮ সালে জাতীয় সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বার বার মিলনায়তন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে কখনো বদি ভাই কখনো চন্দনদার হাতে মাইক্রোফোন। পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যেতো। সেই সম্মেলনে আমি প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটিতে সম্ভবত মফস্বল থেকে বয়সে সর্ব কনিষ্ট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি।
অধ্যাপক বদিউর রহমান অথার্ৎ বদি ভাইকে নিয়ে আমার উপলব্দির জায়গাটি হচ্ছে এমন, উদীচী যদি একটি সংস্কৃতি চচার্র পাঠশালা হয়ে থাকে সেই পাঠশালার একজন দক্ষ শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক বদিউর রহমান। ধীর স্থির ও শান্ত স্বভাবেই এই গুণি মানুষটির কাছে প্রতিনিয়ত আমরা শিখেছি। ‘যে নদীর গভীরতা যতো বেশী সে নদীর বয়ে চলার শব্দ ততো কম’ এই প্রবাদবাক্যটিই মনে হতো আমার বদি ভাইকে দেখে। নিবৃতচারী একজন সাদামাটা মানুষ কিন্তু সকল কাজেই তাঁর সরব উপস্থিতি। তাঁর সাহিত্য ভাবনা, সংস্কৃতি পাঠ, গণমাধ্যম, অধ্যাপনা কিংবা সাংগঠনিক দক্ষতা প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন সব্যসাচী হিসেবে পরিচয় ফুটে ওঠে।
উদীচীর সংগঠকের বাইরে একজন অধ্যাপক বদিউর রহমানকে যখন সহিত্যকর্মে দেখি, সেখানে তাঁর মৌলিক ও গবেষণা গ্রন্থ সাহিত্য স্বরুপ, ছন্দ অলঙ্কার রসতত্ত্ব, বাংলার চারণ মুকুন্দ দাস, রবীন্দ্র জীবনের আশি বছর, সাহিত্য—সংজ্ঞা অভিধান, পাশ্চাত্য সাহিত্য তত্ত্ব সাহিত্যে এক অনবদ্য সৃষ্টি। সম্পাদনার ক্ষেত্রেও সত্যেন সেন রচনাবলি প্রথম খণ্ড থেকে অষ্টম খণ্ড, সত্যেন সেন ধ্রুপদী গণ কথাশিল্পী, অগ্রন্থিত রণেশ দাশগুপ্ত, অশ্বিনীকুমার রচনা সংগ্রহ, মুকুন্দ দাসের যত লেখা, মুকুন্দ দাসের দেশগান, মাইকেল মধুসুদন দত্ত—এর প্রহসন তাঁর সাহিত্য কর্মে নতুন পালক যুক্ত করেছে।
.jpeg)
তাছাড়া অনুবাদ করেছেন বেশ ক’জন বিশ্ব বিখ্যাত লেখকদের গ্রন্থ। যেটি তাকে এক অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যেমন— এরিস্টটলের পোয়েটিকস, লঙ্গিনাসের সাহিত্য—তত্ত্ব, হোরেসের আর্স পোয়েটিকা, প্লেটোর কাব্য ভাবনা, ক্রিস্টোফার কডওয়েলের ইলুশান এন্ড রিয়েলিটি, বার্ট্রান্ড রাসেলের সমাজ বিজ্ঞানের প্রভাব, ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা, নয়া মানবতাবাদ, গণনাট্য, দ্য প্রফেট, দ্য ম্যাডম্যান, দ্য স্যন্ড এন্ড ফোম, দ্য প্রিন্স ইত্যাদি।
শিক্ষকতার পাশাপাশি ১৯৬২ সালে দৈনিক পূর্বদেশ প্রত্রিকার বরিশাল প্রতিনিধি হিসেবে সাংবদিকতার হাতেখড়ি। পরবতীর্তে দৈনিক আজাদ, এপিপি, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, বাসস এর বরিশাল প্রতিনিধি ছিলেন। বরিশালের স্থানীয় দৈনিক দক্ষিণাঞ্চলের নিবার্হী সম্পাদক এবং দৈনিক প্রথম আলো’র দক্ষিণাঞ্চলীয় বিশেষ প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করেন তিনি। সাংবাদিকতার বণার্ঢ্য জীবনে তিনি আরও দায়িত্ব পালন করেন দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক এবং দৈনিক বাংলাদেশ সময় পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে।
তিনি দেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত কলাম ও বেসরকারী কিছু প্রতিষ্টানের প্রকাশনায় ফিচার লিখতেন। এছাড়াও, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড পরিচালনা কমিটির নির্বাহী সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন অধ্যাপক বদিউর রহমান।
সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে তার বিচরণ ছিলো সর্বত্র। প্রগতিশীল চিন্তা—চেতনায় বিশ্বাসী সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়া সংগঠনগুলোকে নিবিড় পরিচযার্য় বেড়ে ওঠতে পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। স্থানীয় পর্যায়ে বরিশাল নাটক, বরিশাল চারুকলা বিদ্যালয় এবং বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, চারণ চলচ্চিত্র সংসদে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাহিত্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, এমাদুল্লাহ পাঠাগারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট, বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি এবং বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির জীবন সদস্য ছিলেন অধ্যাপক বদিউর রহমান।
১৯৭২ সালে শুরু হয় উদীচীর সাথে তাঁর পথচলা। প্রায় তিন দশক তিনি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গণ সাংস্কৃতিক এই সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ৪ জুন ২২ তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি প্রথমবার উদীচীর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের ২০ জুন ২৩তম জাতীয় সম্মেলনে তিনি পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের রিজিম চেঞ্জ হওয়ার পর দেশ একটি সংকট অতিক্রম করছিলো। অগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিষাক্ত ছোবলে দেশ যখন টালমাটাল অবস্থা তখন শক্ত হাতে তিনি উদীচীকে নিজ সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন। উদীচীতে বিভাজনের রাজনীতি থেকে রক্ষা করতে শেষ দিন পর্যন্ত আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।
আমার যতোদূর মনে পড়ছে, কেন্দ্রীয় সংসদের প্রতিটি সভায় যে কোন জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে খুবই মৃদুস্বরে আলোচনা শুরু করতেন। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট প্রাসঙ্গিক গল্প জুড়ে পরিবেশ শান্ত করতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। আমি কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে পেয়েছি অধ্যাপক যতীন সরকার, কামাল লোহানী, গোলাম মোহাম্মদ ইদু, ড.শফিউদ্দিন আহমেদ এর পরেই অধ্যাপক বদিউর রহমানকে। ড.শফিউদ্দিন আহমেদ প্রায়শই শারীরিক অসুস্থতার কারণে সভাপতি হিসেবে সভা সমাবেশে উপস্থিত থাকতে পারতেন না। বেশির ভাগ সময় সভাপতির শূন্যতা পূরণ করতেন বদি ভাই। তখন থেকেই সংগঠনের সভাপতির অলিখিত দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সরব উপস্থিতির কারণে সংগঠন কোন ধরণের সভাপতি শূন্যতা অনুভব করেনি। সভা শুরু হওয়ার পূর্বেই তিনি প্রতিটি সভায় উপস্থিত থাকতেন যা দেখে আমরা জুনিয়র নেতৃবৃন্দরা বিলম্বে যুক্ত হওয়ার কারণে অনেক সময় লজ্জায় পড়ে যেতাম।
২০১২ সালে যোদ্ধাপরধীর রায়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের কার্যক্রম শুরু হলে উদীচী শুরু থেকেই আন্দোলনে রাস্তায় নেমে আসে। সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে শাখা গুলোর সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকী করণের বিরুদ্ধে এবং সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা বাস্তবায়ণ আন্দোলনে। সিডর, করোনা মহামারি, ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যাসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষ যখন দিশেহারা তখন তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় কাজ করেছেন সার্বক্ষণিক। প্রগতিশীল আন্দোলনে সব সময় সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। সা¤্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী প্রতিটি কর্মকান্ডে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন আমৃত্যু। এই সকল লড়াইয়ের মূল শক্তি ছিলো তাঁর প্রাণের সংগঠন উদীচী। কিন্তু এই উদীচীর ভেতরে থাকা কিছু পথভ্রষ্টরা পুরস্কারের বদলে তাকে নিয়ে নোংরামিতে মেতে ওঠে। এই বিষয়টি তাঁকে মানসিকভাবে ভীষণ পিড়া দেয়।
বিষয়গুলো যেহেতু কাছ থেকে দেখা তাই প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হয়। ২০২৫ সালে উদীচীর ২৩তম জাতীয় সম্মেলনের ঘটনা। অধ্যাপক বদিউর রহমানের সভাপতিত্বে নানান ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের অধিবেশন শেষ হয়ে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসাবে একটি পক্ষ বিষয় নিবার্চনী কমিটি পাশ করিয়ে নেয়। বিষয় নিবার্চনী কমিটির সভাপতি করা হয় সহসভাপতি হাবিবুল আলমকে। সংগঠনের ট্রেডিশান অনুসারে একটি প্রস্তাবিত খসড়া কমিটিতে অধ্যাপক বদিউর রহমানকে সভাপতি এবং জামশেদ আনোয়ার তপনকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি প্রস্তাব করে বিষয় নিবার্চনী কমিটি। প্রস্তাবের বাইরে প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বিভিন্ন পদে নাম চাওয়া হলে প্রায় দেড়শতাধিক প্রতিনিধি বিভিন্ন নাম প্রস্তাব করেন। তবে সকল বিতর্কের ঊর্ধে সভাপতি পদে কেবল একটি মাত্র নাম অধ্যাপক বদিউর রহমানের নামটি বলবৎ থাকে। বিষয় নিবার্চনী কমিটি থেকে আমাকে পূর্বের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় সদস্য প্রস্তাব করেন কিন্তু বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধি আমার নাম সহসভাপতি হিসেকে প্রস্তাব করেন। ঠিক একই ভাবে আমাদের আরো বহু নেতৃবৃন্দের নাম বিভিন্ন পদে প্রস্তাব করেন। শুরুতেই দুই প্রস্তাবের ব্যপারে বিষয় নিবার্চনী কমিটি আমার মতামত জানতে চাইলে আমি স্টেজে এসে মাইক্রোফোনে বিষয় নিবার্চনী কমিটির প্রস্তাবিত সদস্য পদ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেই এবং হাউস থেকে আসা সহসভাপতি পদে প্রস্তাবিত নামটি বহাল রাখতে বলি। এভাবে বিষয় নিবার্চনী কমিটি প্রদত্ত ০৯টি পদ থেকে নাম প্রত্যাহার এবং হাউস থেকে আসা ২৭টি নাম প্রস্তাবে বহাল থেকে যায়। হাউস চেয়েছিলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিবার্চনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নিবার্চন করা হবে। কিন্তু বিষয়টি অমিমাংসিত রেখেই নিবার্চনী কমিটির সভাপতি হাবিবুল আলম, জামশেদ আনোয়ার তপনসহ গোটা কয়েকজন বল প্রয়োগের মাধ্যমে কমিটি পাশ পাশ বলে চিৎকার করতে চাইলে বিপত্তি বাধে। অধিকাংশ প্রতিনিধিরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। শুরু হয় মিলনায়তনে হট্টগোল। পরিস্থিতি সামাল দিতে সহসভাপতি মাহমুদ সেলিম প্রথমে মাইক্রোফোন চাইলে তাঁকে মাইক্রোফোন দেয়া হয়নি। যে মাহমুদ সেলিম দীর্ঘদিন শ্রম ও ঘাম ঝরিয়ে সংগঠনের ঝান্ডা ধরে রেখেছিলেন। পরে সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান ধীর স্থিরভাবে এগিয়ে যান। পরিবেশ শান্ত করতে মাইক্রোফোন চাইলে তাঁর সাথে খুবই অপমানজনক ব্যবহার করেন হাবিব—তপন। এক পযার্য়ে প্রতিবাদকারী প্রতিনিধি ভাই ও বোনদের গায়ে আঘাত করতে শুরু করেন হাবিব—তপনদের সাথে থাকা উশৃঙ্খল কিছু তরুণ। এই উদ্ভট পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ জানিয়ে সকল প্রতিনিধিরা মিলনায়তনের বাইরে চলে আসেন। পরে বিক্ষুব্দ হয়ে অধিকাংশ প্রতিনিধিরা সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে অধ্যাপক বদিউর রহমানকে সভাপতি এবং অমিত রঞ্জন দেকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। সেই সুযোগে অধ্যাপক বদিউর রহমানকে তারা জোড়পূর্বক মিলনায়তন থেকে বের করে নিয়ে যায়। পরের দিন অধ্যাপক বদিউর রহমান ভিডিও বাতার্র মাধ্যমে পুরো বিষয় সবার সামনে তুলে ধরেন এবং জোড় পূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানান।
পরবতীর্তে তিনি ঐতিহাসিক এই সংগঠনের ঐক্য ধরে রাখতে প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যান। কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বের সাথে বহুবার আলোচনা করেন এর একটি মিমাংসা করার জন্য। আলোচনা করেন উদীচীর প্রাক্তন নেতৃবৃন্দের সাথে। প্রগতিশীল আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে। সর্বশেষ তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যে দুইটি কমিটি তাঁকে সভাপতি নিবার্চন করে কমিটি ঘোষণা করেছে এই দুটিই অবৈধ। সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনের যে অংশে এসে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে সেখান থেকে শুরু করে অসমাপ্ত সম্মেলন সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উদীচীর প্রাক্তন নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় প্রত্যেক প্রতিনিধিকে ব্যক্তি পর্যায়ে চিঠি দিয়ে সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার আহবান করেন। সেই সম্মেলনে অধিকাংশ প্রতিনিধি এবং জেলা ও শাখা সংসদ উপস্থিত থেকে গণতান্ত্রিক পন্থায় গোপন ব্যালেটের মাধ্যমে নিবার্চন সম্পন্ন করেন। একই আদর্শের অগ্রজ রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির ভেতরে অনৈক্য, নেতৃত্বের দ্বন্দ এবং পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি উদীচীকে ঐক্যবন্ধ করতে মূল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাছাড়া উদীচীর কিছু পদলোভী নেতৃত্ব এক হতে চায়নি। তাই একটি ক্ষুদ্রতম অংশ এই সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করেনি। অধ্যাপক বদিউর রহমান সম্মেলনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আপ্রাণ চেষ্ট করে গেছেন সম্মেলনের দিন পর্যন্ত।
অধ্যাপক বদিউর রহমান আমাদের প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম পদপ্রদর্শক। বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক এবং মুক্তচিন্তার অন্যতম প্রতীক। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম নেতা আর্নেস্তু চেগুয়েভারার ভাষায় বলতে চাই ‘বিপ্লবের কিংবা আদর্শের যেমন মৃত্যু নেই’ ঠিক তেমনি আমিও বলতে চাই অধ্যাপক বদিউর রহমানের মতো আদর্শবান মানুষেরও মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মের মাধ্যমে। উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন—রণেসের উত্তর আকাশের ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে পথ দেখাবেন নবাগত বিপ্লবীদের। যারা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সম্মুখভাগে থেকে মানুষ ও মানবতার জন্য জীবন বাজী রেখে লড়াই চালিয়ে যাবে। তিনি বেঁচে থাকবেন উদীচীর প্রতিটি শিল্পীকমীর্র হৃদয় কুটিরে।
আজ অধ্যাপক বদিউর রহমানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
লেখক: সহসভাপতি, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ। চ্যানেল আই ও দৈনিক বাংলা পত্রিকার সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন