বৈষম্যের উষ্ণতা কেড়ে নিচ্ছে প্রশান্তির ঘুম

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ২৩:২১

শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ হলো ঘুম। যে মানুষের ঘুম নেই, সে স্বাভাবিক নয়, তাঁকে অপ্রকৃতস্থ বিবেচনা করা হয়। ঘুম আমাদের শরীর ও মস্তিস্ককে বিশ্রাম দেয়, ক্লান্তি দূর করে এবং সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে এবং শরীরের বৃদ্ধি ও মেরামতে সাহায্য করে। তাই সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক ৭—৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের নানা স্তর আছে। গভীর ঘুম না হলে (যে ঘুমে সাধারণত কোনো স্বপ্ন দেখা সম্ভব হয় না) শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও শক্তি পুনরুৎপাদন করতে পারে না। বহু মানুষ আছেন যাঁরা বিছানায় আট/নয় ঘন্টা ঘুমানোর পরেও শরীরে সতেজতা অনুভব করেন না, তাঁদের ক্লান্তি দূর হয় না। এই ধরনের হালকা ঘুমে মানুষের শরীর ও মন উভয়ই খারাপ থাকে। ঘুমে ব্যাঘাতের নানা কারণ আছে। শরীরে অন্যান্য রোগ থাকলে যেমন ঘুমের ব্যাঘাত হয় তেমনি মানসিক কোনো অসুস্থতার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে সবচাইতে বেশি।

 

এর বাইরে আমরা যে আর্থ—রাজনৈতিক কাঠামোতে বসবাস করি, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার জন্য তাও সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। দুশ্চিন্তা, অভাব, ভয় নিয়ে কেউই নিশ্চিন্ত ঘুম দিতে পারে না। আগামীকাল কী হবে এমন নানা ধরনের উদ্বেগ প্রতিনিয়ত আমাদের নির্ঘুম রাত কাটাতে বাধ্য করে। সুতরাং গভীর ঘুমের জন্য যেমন শারীরিক সুস্থতা দরকার তেমনি একটি বৈষম্যহীন ও সুখকর সমাজ কাঠামোও সমান অপরিহার্য। এর ভিতর নতুন গবেষণার আরেকটি ফলাফল পাওয়া গেলো যা মানব জাতির উদ্বেগ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট। আমরা জানি বিশে^ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত শুরু হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রাল গত বৃহস্পতিবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের ঘুমে কেমন প্রভাব বিস্তার করে চলেছে তার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গবেষণাপত্র অনুসারে পৃথিবীর নানা প্রান্তে দিন ও রাতের উষ্ণতা বাড়ার তথ্য মিলেছে। ভাবা হয়, দিনের চাইতে রাত সাধারণত শীতল হয়। কিন্তু এই গবেষণা প্রমাণ করেছে, এখন রাতের তাপমাত্রাও ক্রমাগত কাড়ছে। গবেষণা অনুযায়ী পৃথিবীর এক হাজার ৩৩৮টি বড় শহরে তাপমাত্রাজনিত ঘুমের ক্ষতি প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। সাধারণত রাতের উষ্ণতা বাড়লে বৃদ্ধ, শিশু ও অসুস্থ লোকরা ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। বর্তমানে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকা শহরে এই প্রভাবে বছরে মানুষের ঘুমের পরিমাণ কমে গেছে যথাক্রমে ৮৭, ৭৯ ও ৭৬ ঘণ্টা। বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ব্যক্তি অর্থাৎ গরিবরাই এই সমস্যায় বেশি ভোগছেন। ধনি ব্যক্তিরা রাতের বর্ধিত তাপমাত্রা কৃত্রিমভাবে কমানোর নানা উপকরণ  (যেমন ফ্যান, এসি, এয়ারকুলার ইত্যাদি) ব্যবহার করতে সক্ষম। তাঁরা অর্থ খরচের বিনিময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতকে মোকাবিলা করতে পারছেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষ এই অর্থ খরচ করে কৃত্রিম শীতল পরিবেশ তৈরি করতে অক্ষম। অর্থাৎ শিল্পোন্নত দেশগুলোর অবিবেচক কর্মকাণ্ডের ফলে বৈশি^ক তাপমাত্রার যে পরিবর্তন ঘটছে তার প্রতিফল ভোগ করতে হচ্ছে বিশে^র দরিদ্র মানুষকে। কিন্তু সুচতুরভাবে দারিদ্রতার বিষয়টিকে ঢেকে রেখে অন্য অনেক বিষয়কে সামনে আনা হয়, যা মূল কারণকে অস্বীকার করার নামান্তর। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার জন্য পৃথিবীর এখন খুব বেশি দরকার বৈষম্য ও দারিদ্রতা নিরসন। এটি সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়। বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলবৎ রেখে বৈষম্য কিংবা দারিদ্রতা কোনোটাই কমানো সম্ভব নয়। 

 


সামনে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে। কারণ সম্পদ বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু এই বৈষম্য কমিয়ে সুষম সমাজ প্রতিষ্ঠার কার্যকর কোনো রাজনৈতিক তৎপরতার জোরালো উপস্থিতি লক্ষণীয় নয়। গণমুখী রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়লে জলবায়ু পরিবর্তন হওয়ার কারণগুলোও দূর হওয়ার পথ সুগম হয়। কারণ এখন যে মুনাফাবাজির জন্য বিশ^—অর্থনীতি পাগলপ্রায় হয়ে আছে, পরিবর্তিত গণমুখী বিশ^—ব্যবস্থায় তখন তা সম্পূর্ণ মানবকল্যাণকামী তৎপরতায় পর্যবসিত হবে। পৃথিবীতে সম্পদের কোনো অভাব নেই। কিন্তু এই সম্পদের উপর মানুষের ন্যায্য অধিকার নেই। যতক্ষণ সম্পদের উপর সর্বজনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা না যাবে ততক্ষণ মানব সভ্যতার ক্ষতিকর প্রপঞ্চগুলোর বাড়—বাড়ন্ত নিয়েই আমাদের ধুকতে হবে। সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মো্কাবিলার একমাত্র পথ হচ্ছে বর্তমান শোষণমূলক রাজনীতি—অর্থনীতিকে কল্যাণের ধারায় বদলে দেয়া। তখন মানুষকে আর নিঘুর্ম রাত কাটিয়ে সৃজনশীলতা হারাতে হবে না। এ বিষয়ে বিশ^বাসীকে সোচ্চার হতে হবে। নিজের টিকে থাকার এই লড়াই মানুষের সহজাত অধিকার। আসুন পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে চলমান অন্যায্য ব্যবস্থার বিলোপ সাধন করে নতুন এক পৃথিবী গড়ে তুলি।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার