প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৩২
সোমবার বাংলাদেশ সময় ভোরে ফিফা বিশ^কাপ ফুটবল ২০২৬—এর শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে টানা ৩৯ দিনের ফুটবল উন্মাদনার সমাপ্তি ঘটলো। দুর্দান্ত, গতিময় ও তারুণ্যনির্ভর দল হিসেবে স্পেন যথাযোগ্যতার ভিত্তিতে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১—০ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জিতে নিল। ১—০ গোলের পরিসংখ্যান দেখে বুঝার উপায় নেই ফাইনাল খেলাটি কতোটা একতরফা ছিলো। এদিন আর্জেন্টিনা খেলায় ন্যূনতম আধিপত্য দেখাতে পারেনি। পুরো খেলা ছিলো স্পেনের দখলে। আর্জেন্টিনার বাজপাখি খ্যাত গোলকিপার মার্তিনেজের অন্তত ১১ টি দুর্দান্ত সেভ না হলে এই খেলা আর্জেন্টিনা আরও বড় ব্যবধানে হারতে পারতো। আর্জেন্টিনা যে ফাইনাল পর্যন্ত উঠে এসেছে তাও এক আশ্চর্য বাস্তবতা। তাঁরা অধিকাংশ খেলাই জিতেছে খেলার শেষ সময়ে অতিমানবীয় কোনো মুহূর্ত রচনার মধ্য দিয়ে। বলাই বাহুল্য ওইসব ম্যাজিক মোমেন্ট তৈরির পিছনে তাঁদের ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা লিওনেল মেসির ভূমিকা অতুলনীয়। একক কোনো ব্যক্তির উপর অতিনির্ভরতা এবং দলগত দক্ষতার ঘাটতি থাকলে চূড়ান্ত সফলতা পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে স্পেন ছিলো অদম্য, সকলে মিলে একটি দল। তাঁরা সকলে মিলে একটি ঐকতান তৈরি করেছে এবং প্রতিপক্ষকে দুমড়েমুচড়ে ছুড়ে দিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও রানার্সআপ আর্জেন্টিনাকে অভিনন্দন।
প্রতি মৌসুমেই বিশ^কাপ ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশে তুমুল উন্মাদনা তৈরি হয়। এতো উন্মাদনা পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমনকি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোতেও দেখা যায় না। বাংলাদেশ বিশ^কাপে না থেকেও প্রবলভাবে নিজেদের এই বৈশি^কমঞ্চে হাজির রেখেছে এই পাগলপ্রায় দর্শকদের জন্য। বাংলাদেশের এই ফুটবলপ্রেম বিশ^ মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে এবং একটি ফুটবলপ্রিয় জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয়গর্ব প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকরা মোটাদাগে ল্যাটিন আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবলের নন্দিত দুই দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থনে বিভক্ত। এই বিভক্তি ও সমর্থন এতোটাই শক্তিশালী যে, যে কারও মনে হবে আমাদের দেশের দুই জনপ্রিয় ক্লাব বুঝি খেলছে। এই উন্মাদনার কারণেই ২০২২ বিশ^কাপের পর বাংলাদেশীদের আর্জেন্টিনাপ্রীতিতে আপ্লুত হয়ে ওই দেশটি বাংলাদেশে বন্ধ করে দেয়া দুতাবাস ২০২৩ সনে পুনরায় চালু করে। ফুটবল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে তা এ থেকে প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশি ফুটবল সমর্থকরা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ। তাঁরা নিজেদের পছন্দের বাইরে আর কিছু ভাবতে অভ্যস্ত নন। ফলে সমর্থকদের দুই পক্ষের মধ্যে সর্বদা টানটান উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা যায়। ফুটবল বিনোদনের অংশ। নির্মল বিনোদনে কারও পক্ষাবলম্বন খারাপ কিছু নয়। কিন্তু এই পক্ষালম্বন যখন মাত্রা ছাড়ায়, ভদ্রতা ও ভব্যতার সীমা ছাড়িয়ে অশালীন আচরণে পরিণত হয়, সমর্থন শেষ পর্যন্ত সহিংসতার রূপ নেয়; তখন এই ধরনের আবেগ অযৌক্তিক এবং তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। দুঃখজনক বিষয় হলো জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্বয়ং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন তখন পর্যন্ত এই বিশ^কাপ সমর্থনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ১০ ব্যক্তির করুণ মৃত্যু ঘটেছে। বিনোদন যখন কারও মরণ ডেকে আনে তখন তা আর নিছক বিনোদন থাকে না। তা হয়ে উঠে জিঘাংসা চরিতার্থ করার উপলক্ষ। এই ধরনের অতি আবেগীয় অন্ধ সমর্থন করা থেকে ভবিষ্যতে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
বরং বিশ^কাপ ফুটবলের অনুপ্রেরণা আমাদের ধারণ করা আবশ্যক। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার কেপভার্দে বা তার চাইতে কম জনসংখ্যার কোরাসাও যদি বিশ^কাপে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে ১৮ কোটি জনসংখ্যার বিশাল বাংলাদেশ কেন তা পারে না; এই আত্মবিশ্লেষণে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। কেবলমাত্র তা করা গেলেই আমাদের বিশ^কাপপ্রীতি সার্থকতা পাবে। নতুবা আমাদের আরও বহুকাল অন্য দেশের সমর্থক হয়েই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হবে। একসময় আমাদের রাজধানী ও মফস্বলকেন্দ্রিক ক্লাবভিত্তিক জনপ্রিয় ফুটবল কাঠামো ছিলো। এখন বিশ^কাপ ফুটবল নিয়ে যে উন্মাদনা দেখা যায়, একসময় মোহামেডান—আবাহনী নিয়ে একই ধরনের উন্মাদনা ছিলো। আজ তা হারিয়ে যাওয়া গল্পের বিষয়বস্তু। পিছাতে পিছাতে আমরা কোথায় যে চলে গেছি তা নিজেরাও জানি না। বিশ^কাপ ফুটবল আমাদের পেছনে ফিরে তাকিয়ে সামনে বাড়ার সুযোগ করে দেয়। রাষ্ট্র, সরকার এবং ক্রিড়া সংগঠকদের দেশের মানুষের ফুটবল নিয়ে এই প্রবল ভালোবাসাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেজন্য কার্যকর চিন্তা—ভাবনা শুরু করতে হবে। সম্প্রতি আমাদের জাতীয় দল এবং বয়সভিত্তিক দলগুলো ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে ধাবমান। তবে দেশীয় ক্লাব ফুটবল কাঠামো এখনও পেছনেই রয়ে গেছে। আমাদের ফুটবল ভালোবাসার গরিমা ফুটবল দক্ষতায় পরিবর্তন করার এখনই সময়।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন