প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬ ২০:৪২
জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) মাধ্যমে দেশে নতুন তিনটি গ্যাসকূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বেগমগঞ্জ—৫, বেগমগঞ্জ—৬ ও সুনেত্রা—২ এলাকায় এই গ্যাস কূপ খনন করা হবে। এর মধ্যে বেগমগঞ্জ—৫—এ মূল্যায়ন উন্নয়ন কূপ এবং বেগমগঞ্জ—৬ ও সুনেত্রা—২—এ অনুসন্ধানমূলক কূপ খনন করা হবে। এ লক্ষে ৭২৯ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়সম্বলিত প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উত্থাপন হতে পারে বলে গণমাধ্যমসূত্রে জানা গেছে। এই কূপ খননের আগে পেট্রোবাংলা এসব এলাকায় ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার পর পরবর্তী বৃহত্তর প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ এসব স্থানে বাণিজ্যিক বিবেচনায় উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ থাকার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। দেশে এখন যেসব কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে সেগুলোর মজুদ কমে গেছে এবং দৈনিক গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে। এরকম অবস্থায় দেশে নতুন গ্যাসকূপ পাওয়া না গেলে জ¦ালানি সংকট আরও বাড়বে। তাই বর্তমান সরকার দেশের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে মোট ১৫০টি কূপ খনন করবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান। প্রস্তাবিত ৩টি কূপে সফলভাবে খনন শেষ করা গেলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩৫ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। এই তিনটি কূপে মজুদ গ্যাসের আর্থিক মূল্যমান ১ লাখ ২০ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের হ্রাসমান গ্যাস আহরণের প্রেক্ষিতে নতুন তিনটি কূপ খননের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক এবং জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষে সরকারের যথোপযুক্ত পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি। জাতীয়ক্ষেত্রে অর্থবহ ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য দরকার মৌলিক উন্নয়ন, সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন সম্পদের আবিষ্কার। মেগাপ্রকল্পের নামে অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের চাইতেও আমাদের সম্পদ আহরণ ও উৎপাদনের দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিৎ। বর্তমানে জ¦ালানি খাতে দেশ থেকে প্রতিবছর দেড় থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকা খরচ হয়। গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়বে। এরকম অবস্থায় যদি দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় তাহলে এর চাইতে বড় সুখবর আর কী হতে পারে ? বাংলাদেশে স্থল ও জলভাগে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞমহল থেকে বলা হয়। স্থলভাগের মজুদ গ্যাসের বড় অংশ ইতোমধ্যে আহরণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
আরও হয়তো কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত অঞ্চলে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তেমন অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। স্থলভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের সাথে বঙ্গোপসাগরের দিকেও এখন নজর দেয়ার সময় এসেছে। এজন্য আমাদের অনুসন্ধান—সক্ষমতা বহুলাংশে বাড়াতে হবে, দরকার হলে এসব জায়গায় বিদেশি বিনেয়োগ আহ্বান করা যেতে পারে।
ধর্মপাশা অঞ্চলে এর আগে সুনেত্র গ্যাসক্ষেত্রে কূপ খনন কাজ অনেক এগিয়ে গেলেও মাঝপথে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন বলা হয়েছিলো এই কূপে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই বক্তব্যটি সাধারণ্যে তেমন বিশ^াসযোগ্যতা পায়নি। কারণ চূড়ান্ত খনন শুরু করার আগে বহুভাবে গ্যাসের মজুদ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ধারণা নেয়া হয়। সুনেত্র গ্যাসকূপে খনন কাজ বন্ধ করার পিছনে আন্তর্জাতিক বহুজাতিক সংস্থার কারসাজি থাকতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। এখন যখন একই এলাকায় সুনেত্রা—২ নামে নতুন খনন কাজের প্রকল্প গ্রহণ করা হলো তখন আগের সন্দেহ আরও শক্তিশালী হয়। আমাদের দেশে বহু সিদ্ধান্ত বিভিন্ন হস্তক্ষেপে প্রভাবিত হয়।
মাগুরছড়ায় অক্সিডেন্টাল এবং টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে নাইকোর অবহেলায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে আমাদের যে বিশাল ক্ষতি হয়ে গেলো সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টিও ঝুলে আছে। জাতীয় স্বার্থে অযাচিত হস্তক্ষেপ ও প্রভাবকে অস্বীকার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া শক্তিশালী হলেই কেবল দেশ কাক্সিক্ষত অগ্রগতির জায়গায় পৌঁছাতে পারে। বর্তমান সরকার জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শ্লোগানটি এই উদ্দেশ্যকেই ধারণ করে। তাই আমরা আমাদের সম্পদ আমাদের কাজে ব্যবহারের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামো দেখতে পাবো বলেই বিশ^াস করি। নতুন তিনটি জায়গায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দিয়ে খনন পরিচালনার সিদ্ধান্তও ওই শক্তিশালী অবস্থানের পরিচয়বাহী। আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই এবং দেশের জ¦ালানি সম্ভাবনার সবগুলো উৎস অনুসন্ধানের আওতায় আসুক তা কামনা করি।
আমরা আশা করি আগামী বুধবারের একনেক সভায় গ্যাসকূপ খননের এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করা হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন