ঐতিহাসিক পান্ডারখাল বাঁধটি রক্ষা করুন

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬ ০০:০৩

দোয়ারাবাজার উপজেলার পান্ডারখাল বাঁধটি সুনামগঞ্জ এলাকার মানুষের আবেগ—ভালোবাসায় জড়িত একটি নাম। বৃহত্তর দেখার হাওরের ফসল রক্ষায় ১৯৭৪ সনে নির্মিত এই বাঁধটির পিছনে অত্রাঞ্চলের বহু রাজনীতিক—সমাজসেবীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও দরদ মিশে আছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, প্রাচীন এই বাঁধটি এখন দখল—দূষণের শিকার হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার ঝঁুকিতে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি এই বাঁধের উপর বালু—পাথর—ইট ইত্যাদি রেখে দখল করে নিয়েছেন। বাঁধের উপর পরিচালনা করা হচ্ছে পাথর ভাঙার ক্রাসার মেশিন। স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এই ধরনের দখল—দূষণ বজায় থাকলে বাঁধটির স্থানে স্থানে ফাটল দেখা দিবে। তখন বাঁধটি রক্ষা করা অতিশয় কঠিন হবে। এই বাঁধ ভেঙে গেলে দেখার হাওরের ফসলি জমি আবারও হুমকির মধ্যে পড়বে। দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসন মাঝে—মধ্যে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করলেও তা স্থায়িত্বশীল হয় না। আবারও দখলে চলে যায়। সুনামগঞ্জ—ছাতক সড়কের পান্ডারখাল এলাকায় নির্মিত এই বাঁধের দুই পাশে অনেক বৃক্ষরাজির সমাহার। এইসব বৃক্ষ বড় হয়ে এখন ছায়া—শীতলতায় স্থানটিকে মোহময় করে তুলেছে। বাঁধের পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদী এবং বৃক্ষরাজির সমন্বয়ে পান্ডারখাল এলাকাটি মনোরম রূপলাবণ্যে অনেকের হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। এই বাঁধে খানিকটা সময় কাটানোর জন্য আসেন অনেকে।

 

গ্রীষ্মের তাপদাহ থেকে একটুখানি শীতলতা লাভের জন্যও বহু মানুষের সমাগম ঘটে এই স্থানে। নিছক বেড়ানোর জন্য আসেন বহু প্রকৃতিপ্রেমিক। বলা চলে নিজস্ব রূপ—ঐশ^র্যের কারণে পান্ডারখাল বাঁধটি অনেকটা পর্যটনস্পটের মতো হয়ে উঠেছে। একদিকে দেখার হাওরের ফসল রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা অন্যদিকে এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে বাঁধটিকে যেকোনো দুর্যোগ—দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করা জরুরি। বাঁধ সরকারি স্থাপনা। এর উপর ব্যক্তিবিশেষ কোনোকিছু করতে পারেন না। আমাদের দেশে অনেক অসম্ভবই অবলীলায় সম্ভবপর হয়। সরকারি জায়গাকে নিজের জায়গা ভাবতে অভ্যস্ত লোকের অভাব নেই। বিশেষ করে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের ছত্রচ্ছায় লালিত—পালিত ব্যক্তিরা যাবতীয় অপকর্মের সাথে সরকারি জায়গা দখলের দস্যুবৃত্তিটিও অবলীলায় চালিয়ে যেতে পারেন। সারা দেশে এরকমই হয়ে আসছে। কিন্তু প্রশ্নটি যখন একটি বিশাল হাওরের বোরো জমিকে অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে মুক্ত রাখার; তখন তা প্রতিহত করার ইচ্ছা ও কাজের জোরদার উপস্থিতি থাকাটা কাম্য। অবস্থাদৃষ্টে বুঝা যায়, পান্ডারখালে বালু,পাথর, ইটের ডাম্পিং এলাকায় পরিণত করা কিংবা বাঁধের উপর ক্রাশার মেশিনের মতো পরিবেশ ধ্বংসকারী তৎপরতা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ কেবলই লোকদেখানো। স্থানীয় রাজনৈতিক দায়িত্বশীল ও জনপ্রতিনিধিদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া খুব জরুরি। নতুবা আমাদের পূর্বপুরুষদের শ্রমে—ঘাম—নিষ্ঠা—ভালোবাসায় নির্মিত এই বাঁধটি যদি ভেঙে পড়ে তাহলে অনাগত প্রজন্মের কাছে আমাদের মুখ দেখানোর কোনো উপায় থাকবে না।

 


এখানে একটিই কর্তব্য, একটিই লক্ষ; তাহলো— অবিলম্বে অবৈধ দখলের হাত থেকে ঐতিহাসিক বাঁধটিকে রক্ষা করা। দখলকারীরা রাষ্ট্র—প্রশাসনের চাইতে অধিক শক্তিশালী হতে পারে না। প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা নয়, কঠোর পদক্ষেপ দিয়ে বাঁধের দখলদারদের চিরতরে উচ্ছেদ করতে হবে। সরকারি জায়গায় বিভিন্ন পণ্য মজুদ ও অবৈধ ক্রাশার মেশিন যারা পরিচালনা করছেন তাদের দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনুন। ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তির সাথে সমন্বয় রক্ষা করে দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় জনসাধারণ এবং জনপ্রতিনিধিদের এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। কৃষি উৎপাদনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করার জন্য যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে তা রক্ষা করার দায়িত্ব সকলকে গ্রহণ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা কখনও নিষ্ফল হয় না। গুটিকয়েক অবৈধ দখলদারের কারণে একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত সরকারি বাঁধ বিলীন হয়ে যেতে পারে না। দুর্বৃত্তদের বুঝিয়ে দিতে হবে আইন ও রাষ্ট্রের চাইতে তারা শক্তিশালী নয়। এই না করা গেলে কোনো অন্যায় তৎপরতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ বলয় রচনা করা যাবে না। 

 


অর্ধ শতাব্দী আগে নির্মিত পান্ডারখাল বাঁধটি যাতে আর একদিনও অবৈধ দখলে না থাকে তা নিশ্চিত করতে আমরা দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করি। নৈসর্গিক শোভামণ্ডিত এই জায়গাটি আবারও পুরনো ঐতিহ্যে ফিরে যাক। অমলিন বাতাস, সুশীতল পরিবেশ, নদী ও নিসর্গের মনভুলানো রূপ, তরুশোভা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঢাল হয়ে এই বাঁধটি নিজের প্রবল উপকারী অস্তিত্ব নিয়ে হাজির হোক, এই আমাদের কামনা। দুর্বৃত্ত দখলদারদের কালো হাত থেকে মুক্তি পাক আমাদের একটুকরো সবুজের প্রশান্তি।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার