প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬ ২৩:০০
সরকারের যেকোনো পদক্ষেপের মূলে থাকে জনস্বার্থ সংরক্ষণ ও স্বচ্ছতা বজায়। কাগজে—কলমে এমনটাই আমরা জানি। বাস্তবে সরকারি সিদ্ধান্তের চাতুরিপূর্ণ প্রয়োগ হরহামেশা লক্ষ্য করা যায়, যথাযোগ্য বক্তির পরিবর্তে অন্যকে সুযোগ দেয়ার দৃষ্টান্তও এন্তার। অথনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় পুরো প্রক্রিয়ার বিতর্কিত চেহারা ধারণ করা আমাদের দেশের নৈমিত্তিক বাস্তবতা। যেকোনো বিবেচনায় মানুষের চাইতে যন্ত্র ভালো ফলাফল দেয়ার যোগ্যতা রাখে না। যন্ত্র মানবীয় কাজগুলোকে দ্রততর, সহজতর এবং একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ফলাফল প্রদানের যোগ্যতা রাখে। অনেক মানুষের কাজ একটি যন্ত্র স্বল্প সময়ে অনায়াসে করতে সক্ষম, তাই সকল ধরনের কাজে যন্ত্রের ব্যবহারই মানবসভ্যতা বিকাশে অনুপম ভূমিকা রেখেছে। উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বাইরে সেবাখাতে এখন প্রাযুক্তিক ব্যবহার বেড়েছে। সরকারি সেবাখাতও এর বাইরে নয়। সরকার বহু সেবাকে ডিজিটাল সেবায় রূপান্তর করে সেবাগ্রহীতার দুর্ভোগ, যন্ত্রণা কমিয়েছে, স্বচ্ছতা বজায় রেখে বিতর্কমুক্ত সেবা দানের উদাহরণ তৈরি করেছে।
প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা পাওয়ার বিষয়টি মানুষ এখন একবাক্যে সর্বোত্তম বলে স্বীকার করেছেন। মানুষ যে জায়গায় পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ পায়, যন্ত্র সেখানে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে। যন্ত্রের কাছে তার নির্দিষ্ট প্রোগ্রামিংয়ের বাইরে প্রভাব, অনৈতিকতা, তদবিল এমনসব শব্দ অপরিচিত। যন্ত্রের এই নৈর্ব্যক্তিক গুণাগুণই তার অগ্রযাত্রাকে তরান্বিত করেছে। এই জয়যাত্রা অনাগত ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে থামবে তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। কারণ প্রতি সেকেন্ডে বিশে^র কোনো না কোনো জায়গায় নতুন নতুন প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা সাধিত হচ্ছে, আবিষ্কার হচ্ছে নুতন উপকরণ। এই অবস্থায় বাংলাদেশ যখন উল্টোপথে হাঁটে তখন আশ্চর্য হতে হয় বৈকি। দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির ক্ষেত্রে ২০২৩ সন থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়। এই ব্যবস্থাটি শিক্ষকমহলে সমাদৃত হয়েছিলো। নির্দিষ্ট যোগ্যতাধারী শিক্ষকরা প্রাযুক্তিক বিশ্লেষণে বদলির জন্য নির্ধারিত হতেন এবং বিনা তদবির ও আর্থিক লেনদেন ছাড়াই তাঁরা কাক্সিক্ষত জায়গায় বদলি হতে সক্ষম হতেন। সম্প্রতি সরকার এই প্রাযুক্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে মানব—নির্ভর ব্যবস্থার দিকে পশ্চাদগমনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
কিছুদিন আগে জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে শিক্ষক বদলির ব্যবস্থা করা হয়। কমিটিগুলো যথারীতি আমলানির্ভর এবং এখানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর জন্য ‘গণ্যমান্য’ কোটায় দুইজন ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তির বিধান রাখা হয়। ‘গণ্যমান্য’ ব্যক্তি নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচনার মুখে সরকার কমিটি থেকে ‘গণ্যমান্য’ ব্যক্তি অন্তর্ভুক্তির বিধান বাতিল করে তদস্থলে ‘বিদোৎসাহী’ ও ‘শিক্ষানুরাগী’ দুই জনকে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম করেছেন। অর্থাৎ আগের ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ কে হবেন তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আগের ‘গণ্যমান্য’ নিয়ে যে কারণে সমালোচনা করা হচ্ছিল, নতুন ‘বিদ্যোৎসাহী’ বা ‘শিক্ষানুরাগী’ ব্যক্তি নির্দিষ্টকরণে কি সেই বিতর্কের অবসান ঘটবে ? মানব—সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যবস্থা এখন যে—সব কারণে সমালোচনার মুখে পড়ে সে—সব বাস্তবতা তিরোহিত হয়েছে বলে ভাবার কোনো অবকাশ নেই। সুতরাং নতুন ব্যবস্থাটি যে সর্বতোভাবে অবিতর্কিত থাকবে তা বলা যাচ্ছে না।
তবে সরকার এবার শিক্ষক বদলির জন্য সাতটি অপরিহার্য পূর্বযোগ্যতা নির্ধারণ করেছেন, এগুলো আগেও ছিলো। নতুন করে আবারও পুনরোক্ত করা হলো, এটিও ভালো। বদলির জন্য যেসব যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হলো— চাকুরির মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর হতে হবে, বদলির পর তিন বছর অতিক্রান্ত না হলে পুনর্বদলির জন্য বিবেচিত হবেন না, কেবলমাত্র শূন্য পদের বিপরীতে বদলি করা যাবে, প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন ছাড়া কোনো শিক্ষককে তাঁর আবেদন ছাড়া নিজের বিদ্যালয় থেকে বদলি করা যাবে না, চার বা পাঁচ শিক্ষকবিশিষ্ট বিদ্যালয় এবং যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্র অনুপাত ১ : ৪০ এর বেশি, সে—সব বিদ্যালয় থেকে বদলি করা যাবে না, একই পদের জন্য একাধিক আবেদন পেলে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বদলিযোগ্য হবেন, শিক্ষিকারা স্থায়ী ঠিকানা বা স্বামীর ঠিকানায় বদলির অগ্রাধিকার পাবেন ইত্যাদি। এই যোগ্যতাগুলো আগে প্রাযুক্তিক উপায়ে নিরূপিত হতো, এখন হবে কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। দেখা যাক, প্রযুক্তির চাইতে কমিটি কি অধিকতর স্বচ্ছতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা দেখাতে পারে কি—না। ব্যবস্থা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো টার্গেট গ্রুপকে সর্বোত্তম সেবা দেয়া। নতুন কমিটি প্রথা যদি শিক্ষকদের নিরুদ্বিগ্ন, পক্ষপাতহীন, স্বচ্ছ ও সর্বোচ্চ নৈতিকতা নিয়ে বদলি কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয় তাহলে এটি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। নতুবা আবারও প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হবে। দেখা যাক, সরকারের প্রাথমিক শিক্ষক বদলির নতুন ব্যবস্থাটি কেমন হয়।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন