প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬ ১৯:২০
সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে প্রতিদিন শত শত ‘পারফেক্ট’ জীবনের ছবি ভেসে ওঠে। কারও বিলাসবহুল ভ্রমণ, কারও ক্যারিয়ারের ঈর্ষণীয় সাফল্য, আবার কারও নিখুঁত শরীরচর্চার মুহূর্ত। এই দৃশ্যমান সাফল্যের ভিড়ে আমরা যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আড়াল করে রাখি, তা হলো আমাদের ক্লান্তি। দিনশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের শূন্যতা, অবসাদ কিংবা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার অনুভূতিকে আমরা প্রায়ই ঢেকে ফেলি এক চিলতে কৃত্রিম হাসিতে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ব্যস্ত থাকাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়। “সময় নেই”—বাক্যটি যেন আজ এক ধরনের সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অনবরত দৌড়ের শেষ কোথায়? অন্যের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, পরিবারের প্রয়োজন কিংবা পেশাগত ব্যস্ততা সামলাতে সামলাতে আমরা যে প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছি, সেই মানুষটির খোঁজ রাখার সময় কি আমরা বের করি?
প্রতি বছর ২৪ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবস (International Self-Care Day)। তারিখটির মধ্যেই রয়েছে একটি সুন্দর বার্তা—২৪/৭, অর্থাৎ সপ্তাহের সাত দিন, দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই নিজের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন। আবার, এক মাস আগে, ২১ জুন পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক যোগব্যায়াম দিবস। আপাতদৃষ্টিতে দুটি আলাদা দিবস মনে হলেও, তাদের মূল দর্শন এক—নিজের ভেতরের শক্তি ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই অন্যের জন্য সত্যিকার অর্থে অবদান রাখা সম্ভব।
আমাদের সমাজে ‘নিজের যত্ন নেওয়া’কে অনেক সময় স্বার্থপরতা কিংবা বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়। কেউ মনে করেন এটি স্পা-তে যাওয়া, দামি কেনাকাটা করা বা ছুটি কাটানোর নাম। কিন্তু প্রকৃত স্ব-যত্ন এসবের চেয়ে অনেক গভীর। এটি হলো নিজের শরীর ও মনের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া। মানসিক ক্লান্তির দিনে কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়া, সামর্থ্যের বাইরে কোনো অনুরোধে বিনয়ের সঙ্গে ‘না’ বলতে শেখা, কিংবা রাত জেগে অযথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট না করে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও স্ব-যত্নেরই অংশ।
স্ব-যত্নকে প্রধানত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে চর্চা করা যায়—
শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় যত্ন: শরীর ও মন একে অপরের পরিপূরক। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা ও পর্যাপ্ত পানি পান যেমন জরুরি, তেমনি নতুন কিছু শেখা, বই পড়া, অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ থেকে বিরতি নেওয়া, নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিনয়ের সঙ্গে ‘না’ বলতে শেখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যত্ন: বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানো এবং নেতিবাচক সম্পর্ক বা পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখা। আমাদের সমাজে অনেক সময় বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডাকে ভালো চোখে দেখা হয় না। অথচ ইতিবাচক ও গঠনমূলক আড্ডা মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবিকে, বন্ধুদের সঙ্গে এমন অনেক অনুভূতি, দুশ্চিন্তা বা অভিজ্ঞতা সহজে ভাগ করে নেওয়া যায়, যা সব সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বলা সম্ভব হয় না। আন্তরিক আলাপ, পারস্পরিক সমর্থন এবং হাসি-আনন্দের মুহূর্ত মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং জীবনে এক ধরনের স্বস্তি ও মানসিক মুক্তির অনুভূতি এনে দেয়।
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চর্চা: ধর্মীয় অনুশাসন পালন, প্রার্থনা, ধ্যান কিংবা অন্যান্য আধ্যাত্মিক চর্চা অনেকের জন্য মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শন মানুষের শরীরকে মূল্যবান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। ইসলাম ধর্মে মানবদেহকে মহান আল্লাহর দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ‘আমানত’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সহীহ বুখারীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার শরীরেরও অধিকার রয়েছে।” অর্থাৎ, শরীরের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, পুষ্টি ও যত্ন নিশ্চিত করাও ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ। অনুরূপভাবে, সনাতন দর্শনেও দেহকে আত্মার মন্দির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুস্থ শরীর ছাড়া আত্মিক উন্নতি কিংবা জাগতিক দায়িত্ব—কোনোটিই পূর্ণতা পায় না।
আজকের এই আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবসে আসুন, নিজেদের সঙ্গে একটি ছোট্ট অঙ্গীকার করি। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্য থেকে অন্তত আধা ঘণ্টা সময় শুধু নিজের জন্য রাখব। হাঁটব, বই পড়ব, প্রার্থনা করব, ধ্যান করব, যোগব্যায়াম করব কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কিছু সময় কাটাব—কিন্তু সেই সময়টুকু হবে শুধুই নিজের জন্য। স্ব-যত্ন কোনো একদিনের আয়োজন নয়; এটি একটি জীবনচর্চা।
আন্তর্জাতিক যোগব্যায়াম দিবস আমাদের শেখায় কীভাবে শরীর ও মনকে যত্নে রাখা যায়, আর আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবস মনে করিয়ে দেয়—এই যত্ন কেবল বিশেষ দিনে নয়, বছরের প্রতিটি দিনই প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিজের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত। যে মানুষ নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিতে জানে, সে-ই দীর্ঘদিন পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেনারেল প্র্যাকটিশনার, গ্রীন লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সুনামগঞ্জ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন