প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬ ০০:০৭
পল্লীবন্ধু উন্নয়ন সংস্থা নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে (এনজিও) জামালগঞ্জের কয়েক শ’ গ্রাহকের জমানো ৪০ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন এর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, চার বছর আগে জামালগঞ্জ উপজেলায় একটি ভাড়া বাড়িতে কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট, দৈনিক সঞ্চয় প্রভৃতি নামে তৃণমূল পর্যায়ের গ্রাহকদের নিকট থেকে আমানত সংগ্রহ করা হয়। সম্প্রতি আমানতের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কিছু গ্রাহক টাকা তোলতে এসে দেখতে পান কার্যালয়ে তালা ঝুলানো। প্রতিষ্ঠানটির মাঠকর্মী সীমারানী পল্লীবন্ধুর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জেসমিন আক্তার ও আঞ্চলিক কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে জামালগঞ্জ থানায় জিডি করেছেন। জমানো আমানতের টাকা ফেরত পেতে গ্রাহকরা এখন দিশেহারা। পল্লীবন্ধু উন্নয়ন সংস্থা নামের এই প্রতিষ্ঠানকে একেবারে ভুঁইফেঁার মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রতিষ্ঠানটিও ওয়েবসাইট ঘেঁটে জানা গেছে যে, ১৯৯৯ সন থেকে দেশে প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করেছে। এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, সমাজসেবা অধিদপ্তর, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে থেকে নিবন্ধিত ও স্বীকৃত এই প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশেই বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। জামালগঞ্জ শা্খায় টানানো প্রতিষ্ঠানটির সাইনবোর্ডের লেখা অনুযায়ী বুঝা যায়, জামালগঞ্জে তারা ঘুর্ণায়মান ঋণ তহবিল পরিচালনা করার জন্য কাজ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি উপকারভোগীদের আদৌ কোনো ঘুর্ণায়মান ঋণ বিতরণ করেছে কি—না সে তথ্য জানা না গেলেও তারা যে গ্রামীণ উপকারভোগীদের নিকট থেকে বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করেছে তা স্পষ্ট। গুগল সার্চ করে জানা যায়, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে। অধিক মুনাফা ও সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করে উধাও হওয়া, চাকরি দেয়ার নাম করে বেকার তরুণ—তরুণীদের কাছ থেকে জামানতের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়াসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। আমাদের দেশে এনজিওগুলো প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নিবন্ধন ও স্বীকৃতি নিয়ে কাজ শুরু করলেও এদের কার্যক্রম তদারকি, নিরীক্ষা, পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা লক্ষণীয়। এই সুযোগে কিছু এনজিও সারা দেশে যে প্রতারণার সা¤্রাজ্য তৈরি করেছে তথাকথিত পল্লীবন্ধু উন্নয়ন সংস্থা এর বড় প্রমাণ। জামালগঞ্জের যে উপকারভোগীরা এই প্রতিষ্ঠানের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেই দায় এনজিও—তদারককারি সরকারি প্রতিষ্ঠানের এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি নিবন্ধন ও স্বীকৃতি থাকলে মানুষের কাছে তা বিশ^াসযোগ্যতা পায়। মানুষের এই বিশ^াসের সুযোগ নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভাঙে।
পল্লীবন্ধু উন্নয়ন সংস্থা, জামালগঞ্জ কর্তৃক সংঘটিত অর্থ আত্মসাৎ ও অফিস তালাবদ্ধ করে দায়িত্বশীলদের পলায়ন বিষয়ে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি ডিরেক্টর জনৈক জমিনুর হক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। আমরা গ্রাহকদের অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টির দ্রুত সমাধানের জন্য অভ্যন্তরীণভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে।’ এই ধরনের দায়সাড়া কথা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মন ভুলানো যাবে না। দরকার আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধার করে গ্রাহকদের ফেরৎ দেয়া। জামালগঞ্জে আত্মসাৎ ঘটনাটির সাথে কি এককভাবে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও আঞ্চলিক কর্মকর্তা জড়িত নাকি এর পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক ছলচাতুরি ও প্রতারণা রয়েছে তা উদঘাটনের জন্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দ্রুত তদন্ত শুরু করা উচিৎ। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের নিকট থেকে সংগৃহিত অর্থ কোনো না কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের হিসাবে জমা হওয়ার কথা। এখন ব্যাংক হিসাব থেকে ওই টাকা কীভাবে উত্তোলিত হলো, অভ্যন্তরীণ পরিদর্শন ও নিরীক্ষায় কেন তা চিহ্নিত করা গেলো না; এসব বিষয় পরিষ্কার হতে হবে। অবস্থাদৃষ্টে অনুমিত হয় (বিশেষ করে আরও কয়েকটি জেলায় যখন একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়) পল্লীবন্ধু প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও এই ধরনের অর্থ আত্মসাৎ প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে থাকে অথবা তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অতিশয় শিথিল। প্রতিষ্ঠানটি উপকারভোগী গ্রাহকদের আমানত ফেরৎ দিতে না পারলে এই অপকর্মের দায় পল্লীবন্ধু উন্নয়ন সংস্থার ঘাড়েই বর্তাবে।
প্রতিটি উপজেলায় এনজিও বিষয়ক একটি কমিটি আছে। এই কমিটির মাধ্যমে উপজেলায় কর্মরত সকল এনজিওকে সরকারিভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণের কথা। বাস্তবে তা দেখা যায় না। প্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটিকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। যাহোক পল্লীবন্ধুর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা যাতে অবিলম্বে তাঁদের আমানত ফেরৎ পেতে পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমাদের অনুরোধ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন