বিভাজন নয়, ঐক্যেই সমৃদ্ধি

প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:১১

৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাছনরাজা মিলনায়তনে আয়োজিত জুলাই যোদ্ধা ও জুলাই শহিদ পরিবারকে সংবর্ধনা প্রদান ও আলোচনা সভায় সুনামগঞ্জ—৪ আসনের সংসদ সদস্য বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বিভাজনের রাজনীতি করতে চাই না। আমরা বিশ^াস করি ৫ আগস্টের শিক্ষা হলো ঐক্য, দায়িত্ব ও জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার শিক্ষা।’ মূলত চারদিকের প্রগাঢ় আঁধার দূর করতে ২০২৪ সনের জুলাই—আগস্টে যে অন্তহীন আলোর মিছিল শুরু করেছিলো এ দেশের জাগ্রত ছাত্র, তরুণ ও জনতা; তার পিছনেও ওই ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রত্যয়দীপ্ত আকাক্সক্ষা লুকিয়ে ছিলো। মানুষ উপলব্ধি করেছিলো, যেভাবে গণমানুষের মতামত অগ্রাহ্য করার অসহ্য সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিলো, এর বিপরীতে গণসংহতির নতুন ধারার সূচনা ঘটাতে না পারলে আমাদের প্রিয় স্বদেশভূমির সমৃদ্ধি আটকে যাবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দল—মত—আদর্শ নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ওই আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। কোনো নির্দিষ্ট সাংগঠনিক নির্দেশনা নয়, নয় কোনো দলীয় পরিচয়; তারপরেও অপ্রতিরোধ্য জনে¯্রাত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়েছিলো। বিভাজিত জনতার পক্ষে তা কখনও সম্ভব ছিলো না। ২০২৪ সনের জুলাই—আগস্টে জনতার অভূতপূর্ব ঐক্যই অভ্যুত্থানের নিয়ামক শক্তি ছিলো। কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সেই সংহতি, সেই একতা, সেই আকাক্সক্ষার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো যায়নি। নানাভাবে রাজনৈতিক বিভাজনরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করে। যে ছাত্ররা অভ্যুত্থানের সাংগঠনিক শক্তির প্রাণভোমরা ছিলেন, তাঁরাও বিভাজিত হয়ে গেলেন রাজনৈতিক আদর্শ ও বিশ^াসের ভিত্তিতে। ওই যে বিভাজনের অশুভ ছায়াপাত শুরু হলো তা আজও দেশ—জাতি ও জনগণের এগিয়ে যাওয়ার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছে। ফলে সংসদ সদস্য সত্যিকারভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন, ‘আমরা বিভাজনের রাজনীতি করতে চাই না।’ তাঁর এই শুভবোধের প্রতি আমাদের সংহতি। 
জাতীয়ভাবে তাকালে দেখা যায়, অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো আজ বহুধা বিভক্ত। এই বিভক্তি ছড়িয়েছে সমাজের সর্বস্তরে। বিরুদ্ধ মত ও কথা সহ্য না করার এক শ^াসরুদ্ধকর পরিবেশের দেখা পাওয়া যায়। ৫ আগস্ট উপলক্ষেই রাজধানীতে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে আয়োজিত এক সভায়, যেখানে বিদেশি কূটনীতিকরাও আমন্ত্রিত ছিলেন; সেখানেও বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হতে দেখেছি আমরা। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংহিস তৎপরতা সকলের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি জাতীয় উন্নয়নের যে জায়গায় আমাদের পৌঁছার কথা তা নিশ্চিতভাবেই ব্যাহত করবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, রাশিয়া—ইউক্রেন যুদ্ধসহ জটিল ভূ—রাজনৈতিক সমীকরণের ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ বহু সংকট বেড়েছে।

 

আমদানিযোগ্য পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ করতে না পারায় দেশের বহু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অনেক কারখানা আংশিক বন্ধ রয়েছে। এই সংকট আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে।  জলবায়ুজনিত অভিঘাতে সারা বিশে^ সামনের দিনে খাদ্য উৎপাদনে চরম সংকট তৈরি হওয়া আশঙ্কা বিদ্যমান। এমন জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশ পরিচালনা কঠিন। এর উপর যদি অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অবিশ^াস বৃদ্ধি পায় তাহলে তা আরও চ্যালেঞ্জিং হবে। সুতরাং আমাদের সকল রাজনীতিবিদদের বর্তমান বৈশি^ক, আঞ্চলিক ও জাতীয় সংকটকে গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করে বিদ্যমান বিরূপ পরিস্থিতিতেও দেশকে সঠিক ধারায় রাখার কঠিন—কঠোর দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হতে হবে। ক্ষুদ্র দলীয় সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ায় মনোযোগী হতে হবে।   

 


সুনামগঞ্জের মতো একটি প্রান্তিক জেলা থেকে একজন সংসদ সদস্য বিভাজন দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠার যে তাগিদ অনুভব করেছেন তা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। ঐক্যবদ্ধ জাতিই কঠিন সমস্যা মোকাবিলা করে দুর্যোগ থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারে। একটি দেশে নানা মত ও পথের লোক থাকবেন। তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শও থাকবে। এই বৈচিত্র নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখাই সভ্য জাতির লক্ষণ। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, উন্নয়নের পূর্বশর্ত এবং সমৃদ্ধির নিশ্চয়তা। নতুবা আমরা আবারও অন্ধকারের গহ্বরে পড়ে যাব। তবে আমাদের শক্তির মূল জায়গা হলো, দেশের সাধারণ মানুষ। তাঁরা সর্বাবস্থায় শান্তি, উন্নয়ন ও সহাবস্থানের পক্ষে; তাঁরা বিভাজন, অশান্তি ও গণ্ডিবদ্ধতার বিপক্ষে। জনগণের এই উদার অসীম আকাশসম মানসিকতা ধারণ করে আমাদের রাজনীতিকরা দূরদ্রষ্টা এবং দায়বদ্ধ গণনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে কোনো দুর্যোগ—দুর্বিপাক অপ্রতিরোধ্য এই জাতি ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রকে আটকে রাখতে পারবে না। সুতরাং আসুন, সর্বত্র বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় যার যার অবস্থান থেকে অঙ্গীকারবদ্ধ হই।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার