প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:১৮
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে সিলেট—ঢাকা মহাসড়কে দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জনের মৃত্যু হয়, এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৫ ব্যক্তি। ঘটনার বিবরণ অনুসারে, শুক্রবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ওসমানিনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা থেকে আসা বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাস ও সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। রাস্তার অন্য একটি গাড়ির ড্যাসক্যামের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে, ইউনিক পরিবহনের বাসটি কয়েকবার অন্য গাড়িকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে, এই করতে যেয়ে গাড়িটি সড়কের রং সাইডে চলে আসে। আর তখনই উল্টোদিক থেকে আসা বেঙ্গল পরিবহনের বাসের সাথে সংঘর্ষ হয়। গণমাধ্যমের আরেকটি বিবরণ অনুসারে, বেঙ্গল পরিবহনের বাস একটি পিকআপকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত লেনে চলে আসে এবং তখনই সংঘর্ষ হয়। যেটাই সত্য হোক, আসল কথা হলো— বেঙ্গল বা ইউনিক যেকোনো একটি বা উভয় বাসই ওভারটেক করতে গিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায়। যার ফলশ্রম্নতিতে ৯টি তাজা প্রাণ চলে গেলো। আহত ২৫ জনের কী অবস্থা, তাঁদের কয়জন সংকটাপন্ন সে খবর এখনও জানা যায়নি। তবে ধারণা করা যায়, আহতদের অবস্থাও গুরুতরই হবে।
অর্থাৎ গাড়িচালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনার ফলেই অনেকগুলো জীবন এখন চরম সংকটাপন্ন হয়ে গেলো। এর দায় কে নিবে ? বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রতিকারহীনভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। এক ভয়ানক নৈরাজ্যের জায়গা হয়ে উঠেছে দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলো। কেউ ওখানে কোনো নিয়ম মানে না। স্টিয়ারিং হাতে পেলেই দানবীয় মনোবৃত্তি জাগ্রত হয়ে যায় চালকদের। তাঁর হাতে যে অনেকগুলো যাত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব সেই কর্তব্যবোধ ভুলে একটু আগে যাওয়ার জন্য উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। শনিবার দৈনিক সমকালের অনলাইনে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ঢাকা—সিলেট মহাসড়কে গত ৬ মাসে ১৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৭ জন নিহত হয়েছেন, আহত সংখ্যা ২৭৫ জন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও হাইওয়ে পুলিশের মতে, দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের বেপরোয়া গতির পাশাপাশি যত্রতত্র পার্কিং, মহাসড়কের পাশে ভাসমান দোকান এবং হাটবাজারকেন্দ্রিক যানজট এইসব দুর্ঘটনার কারণ। মহাসড়কে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে যানবাহন চলাচলের কথা। কিন্তু অনেক দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি স্থানবিশেষে ১০০ বা ১৪০ কিলোমিটার গতিতেও চালানো হয়। ফলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। গাড়িচালকরা বিশ্রামের সময় পান না বললেই চলে। ক্লান্তি, অবসাদ, অনিদ্রা নিয়ে গাড়ি চালনার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। এর সাথে যুক্ত হয় নির্দিষ্ট বেঁধে দেয়া সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর বাধ্যবাধকতা। যানজটসহ নানাবিধ কারণে যে সময় নষ্ট হয়, পরে গতি বাড়িয়ে সেই সময় পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ সড়কে যানবাহন চলাচলের নিয়ম নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। কেউ ওই নিয়ম মানে না। নিয়ম মানার জন্য সড়কে নেই কোনো ব্যবস্থাপনা।
ঢাকা—সিলেট মহাসড়ক উন্নীত করার কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলমান। এই কাজ কবে শেষ হবে তা কেউ বলতে পারেন না। উন্নয়ন কাজ চলায় বহু জায়গায় সড়কের অবস্থা খারাপ, কোনো কোনো জায়গায় সড়কের এক পাশ বন্ধ করে দিয়ে অন্যপাশে গাড়ি চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে। এতে গতি মন্থর হওয়াসহ দুর্ঘটনার পূর্বকারণ উদ্ভব হয়। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের কাজ দ্রুত শেষ করার দিকে বিশেষ মনোযোগ আছে বলে মনে হয় না।
শুক্রবারের দুর্ঘটনায় বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী, সপ্তম রায় (প্রিয়ম), হাজী সাইফুল ইসলাম, আবুল হোসেন, জাহাঙ্গীর সৌরভ, আরমান, জায়ফা, সাইফুল ইসলাম ইমন ও নোবেল সূত্রধর নিহত হয়েছেন। এরা লাশ হওয়ার জন্য গাড়িতে উঠেননি। নিরাপদে গন্তব্যে যেতে গাড়িতে উঠেছিলেন। বেপরোয়া চালক তাঁদের প্রাণ কেঁড়ে নিলো। এজন্য কি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী গাড়ি, গাড়ির চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে সড়ক আইন অনুসারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ? নিহতদের পরিবার ও আহতরা কি সড়ক আইনের বিধান মোতাবেক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন ? এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার কি আদৌ কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন ? প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই এই ধরনের অজ¯্র প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কিন্তু কখনও কোনো উত্তর মেলে না। সড়ক পথের গাড়ির মালিক—শ্রমিকরা নাকি ভীষণ শক্তিধর। তাঁদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারে না রাষ্ট্র, সরকার, আইন; এমনই ধারণা জনমনে বদ্ধমূল। এই ধারণার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ও মদদ পাওয়ার বিষয়টি। এসব কারণেই আজ বড় প্রশ্ন হলো এই— এই দেশে সড়ক নিরাপত্তা কি সোনার হরিণ ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন