প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ০০:০০
মঙ্গলবারের (১৯ আগস্ট) দৈনিক যুগান্তরে ‘মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র : গা শিউরে উঠা সদর অন্দর/ ভয়ংকর গোপন কারাগার’ শিরোনামে রাজধানীর মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের ভয়ঙ্কর বাস্তবতা নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি সত্যিকার অর্থেই জনমনে আতঙ্ক তৈরি করার মতো বিষয় বটে। রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা গুলসানে অবস্থিত ‘বীকন পয়েন্ট’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচয় গোপন রেখে ভর্তি হয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক। ওই নিরাময়কেন্দ্রের ভিতরে অবস্থান করে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানলব্ধ প্রতিবেদনের ছত্রে ছত্রে লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সেখানে একদিকে মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামে অভিভাবকদের নিকট থেকে প্রচুর অর্থ নিয়ে অপচিকিৎসা দেয়ার তথ্য যেমন উঠে এসেছে তেমনি পারিবারিক বিরোধের কারণে কাউকে মাদকসেবী বানিয়ে ধরে এনে চিকিৎসার নামে বন্দি ও মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য করার কাহিনীও জানা গেছে। মাদকসেবী হিসেবে কাউকে চিকিৎসা শুরুর পূর্বে তাঁর ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক হলেও ওখানে ওসব টেস্টের কোনো বালাই নেই। ওই প্রতিষ্ঠানে দৈনিক চিকিৎসাব্যয় ২০ হাজার টাকা বা তার চাইতে বেশি। অগ্রিম জমা দিতে হয় বড় অঙ্কের অর্থ। যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক প্রতিষ্ঠানের চাহিদামাফিক ২ লাখ টাকা অগ্রিম পরিশোধ করলে তাঁকে তাৎক্ষণিক ভর্তি করে নেয়া হয়। আদৌ তিনি মাদকাসক্ত কি—না এর ন্যূনতম কোনো পরীক্ষা করা হয়নি। রোগীকে আলো—বাতাসহীন ঘরে আটকে রাখা হয়, বাইরের সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় থাকে না ভর্তি হওয়া কারও। ভিতরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিম্নমানের খাবার, ভর্তি রোগীদের কোনো বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়াই ঔষধ খাওয়ানো হয়। মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে অবাধে চলে ধূমপান। এই পরিবেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মানসিক রোগীতে পরিণত হয়ে যান। প্রতিবেদক ভর্তি হওয়া অনেক রোগীকে অত্যন্ত বিষণ্ণ, খেপাটে ও মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন। সবচাইতে ভয়ঙ্কর তথ্য হলো, কিছু রোগী তিনি দেখতে পান যারা প্রকৃত অর্থে মাদকে আসক্ত ছিলেন না। এমন এজন ধনাঢ্য শিল্পপতি মোহাম্মদ শাহজাহান। সন্তানদের সাথে মতবিরোধের কারণে সন্তানরা তাঁকে মাদকসেবী সাজিয়ে ্ওই কেন্দ্রে জোরপূর্বক পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। জোর করে আনার এই পদ্ধতিকে ‘ক্যাচিং’ বলা হয়। প্রতিষ্ঠানের সাথে উপযুক্ত পদ্ধতিতে যোগাযোগ ও টাকা দিলে প্রতিষ্ঠানের লোকজন পরিবার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জোর করে ধরে আনে, এই পদ্ধতিকে ক্যাচিং বলা হয়। পারিবারিক বিরোধ, দ্বন্দ্ব প্রভৃতির জেরে কাউকে শায়েস্তা করতে চাইলে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সহায়তা করার তথ্য চরম উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশে মাদকসেবীর পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এক ভয়ানক সামাজিক অভিশাপে পরিণত হয়েছে এটি। বহু পরিবার মাদকসেবী সদস্যের যন্ত্রণায় অতীষ্ট। মাদকাসক্তদের নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করে পরিবার তাঁদের সুস্থ্য করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিতরের অবস্থা যা জানা গেলো তা গা শিউরে উঠার মতো বিষয়ই বটে। এইসব প্রতিষ্ঠানে অনেকক্ষেত্রে মাদকাসক্তি দূর করতে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ না করে এবং যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের পরিবর্তে শারীরিক নির্যাতন করাকে মুখ্য বিবেচনা করে বলে ব্যাপক অভিযোগ আছে। একটি রাষ্ট্রের ভিতর মাদকাসক্তি নিরাময়ের নাম ব্যবহার করে এমন নির্যাতন ও নিবর্তনকেন্দ্র কী করে চলতে পারে ? এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের অনুমোদন নিয়েই পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি জানেন না এইসব প্রতিষ্ঠানের ভিতরে প্রকৃতপক্ষে কী হয় ? সমাজে মাদকের ভয়াল বিস্তারকে কেন্দ্র করে সারা দেশেই বহু নিরাময়কেন্দ্র বা পুনর্বাসনকেন্দ্র নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সিলেটেও এমন বহু প্রতিষ্ঠান আছে। যুগান্তরের ওই প্রতিবেদন কেউ কেউ শেয়ার করে লিখেছেন সিলেটের কিছু প্রতিষ্ঠানেও এমন অমানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। অভিযোগগুলো সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরিভাবে খতিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ বলে আমরা মনে করি। এমন নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ফিরে আসা অনেক ব্যক্তির পুনরায় নেশার জগতে ঢুকে যাওয়ার প্রচুর কাহিনী আমাদের জানা আছে। নেশার চক্র থেকে যদি মুক্তই হতে না পারে কেউ তাহলে এসব নিরাময়কেন্দ্র রাখার প্রয়োজন কী ?
সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানহীন ও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রগুলোকে অবিলম্বে চিহ্নিত করে সেগুলোর অনুমোদন বাতিল করাসহ মানসম্পন্ন নিরাময়কেন্দ্রগুলোকে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা করা দরকার। আরেকটি কথা, সর্বস্তরে মাদকের সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রেখে কোনো জনগোষ্ঠীর মাদকাসক্তি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাই মাদকের অবাধ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আগে দমন করতে হবে। মাদকের ব্যবসার সাথে আসক্তি নির্মূলের নামে ভিন্ন আরেক ব্যবসার প্রতারক ব্যবস্থার অবসান চায় সকলে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন