কৈতক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও একই প্রশাসনিক ভজকট

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৫৮

জনবল সৃজন ও পদায়নের অভাবে বিপুল সরকারি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেবাকেন্দ্রগুলো বিনষ্ট হওয়ার ক্রমিক সংবাদে আমরা দিশেহারা। সুনামগঞ্জের খবরে এর আগে সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বয়স্কদের আশ্রয়কেন্দ্র শান্তিনিবাসের খবর প্রকাশ হয়েছিলো। এবার জানা গেলো ছাতকের কৈতকে ১১ কোটি টাকা দিয়ে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটিও নির্মাণের পর থেকে জনবলের অভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

 

 

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই সুনামগঞ্জ—সিলেট সড়কের কৈতকে ২০ শয্যার এই ট্রমা সেন্টার স্থাপন করা হয়েছিলো। কৈতকের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশেই এটি নির্মিত হয়। ২০২৩ সনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া এই ট্রমা সেন্টারে আধুনিক ও উন্নতমানের চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বসানো হয়। ভবনে ১১টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ মেশিন বসানো হলেও অব্যবহৃত থাকতে থাকতে এগুলো এখন নষ্ট হওয়ার পথে। নষ্ট হচ্ছে অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম। পরিত্যক্ত ভবনও নানাবিধ ক্ষয়ক্ষতির শিকার। অথচ সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের সুচিকিৎসায় সুনামগঞ্জ অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য এই ট্রমা সেন্টারটি অন্যতম ভরসার জায়গায় পরিণত হতে পারতো। সুনামগঞ্জ জেলায় এরকম কোনো ট্রমা সেন্টার নেই। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালেও সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের সুচিকিৎসার কোনো বন্তোবস্ত নেই। গুরুতর আঘাতপ্রাপ্তদের জরুরিভিত্তিতে সিলেট নিয়ে যেতে হয়। পথিমধ্যে অনেকেরই জীবন সংশয় হয়। সুনামগঞ্জ—সিলেট সড়কটি অতিশয় ব্যস্ত। অহরহ এই সড়কে ছোট—বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় বহু লোক নিহত ও আহত হয়ে থাকেন। ৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক সমকালে প্রকাশিত এই ট্রমা সেন্টারের সংবাদে জয়কলস হাইওয়ে পুলিশের উপপরিদর্শক মো. জহিরুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, সিলেটের লামাকাজি থেকে সুনামগঞ্জের হাছনরাজা তোরণ পর্যন্ত সড়কের সুনামগঞ্জ অংশে গত ৯ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৭ ব্যক্তির প্রাণ গেছে, এইসব দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি সংখ্যা ১৩৩ জন। এই অঞ্চলের অন্যান্য সড়কের দুর্ঘটনাগুলো হিসাবে আনলে সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে আরও অনেক বড় হবে। ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতেই সরকার বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কের পাশে এমন ট্রমা সেন্টার স্থাপন করেছেন। কিন্তু সরকারই এইসব সেন্টারে কোনো জনবল না দিয়ে অকার্যকর করে রেখেছেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে, জনবলই যদি না দেয়া যাবে তাহলে কেন সরকারি অর্থের বিপুল অপচয় ঘটিয়ে এইসব ভবন নির্মাণ ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি ক্রয় করা ? সরকারি বহু প্রকল্পের বিষয়েই এমন অবস্থা লক্ষণীয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এতোটা উন্নত নয় যে, জনগণের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে এমন অপচয়বিলাস করা যায়। সমস্যা হলো, জনগণের অর্থের এই অপচয় নিয়ে খোদ্ জনতা কাউকে প্রশ্ন করতে পারে না। তাই কোনো কর্তৃপক্ষকেই এমন অপচয়ের জন্য জবাবদিহি করতে হয় না। মূলত প্রকল্পের শুরুতেই জনবলের নিশ্চয়তা বিধান ছাড়া যারা এইসব প্রকল্প প্রণয়ন ও অর্থ খরচ করেন তাঁদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা গেলে এমন অপচয়বিলাস কিছুটা বন্ধ হতে পারতো। আমাদের রাজনৈতিক—প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় জবাব চাওয়া এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো কোনো কাঠামো নেই। ফলে যে দেশের মানুষ এখন অন্ন—বস্ত্র—বাসস্থান—চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার পেতে হিমশিম খান সেই দেশে এমন অপচয় করেও কেউ কেউ পার পেয়ে যেতে পারেন। এই নষ্ট সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আবশ্যক। 

 


সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন বলেছেন, জনবলের অভাবে ট্রমা সেন্টারটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবল নিয়োগের বিষয়টি নিয়মিত উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তিনিই এই জানানো ছাড়া আর কী করবেন ? এইসব সমস্যা নিয়ে যদি আমাদের জনপ্রতিনিধিরা সোচ্চার থাকতেন তাহলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে বাধ্য। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরপর্ব, পয়েন্ট অব অর্ডার, বিশেষ অধিকার ও জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণসহ নানা সেশনে এইসব বিষয় উত্থাপন করা যায়। কিন্তু কার্যত জনগুরুত্বপূর্ণ এইসব সরকারি স্থাপনাকে সেবা—প্রতিষ্ঠান হিসেবে সচল করার জন্য জাতীয় সংসদে এমন প্রসঙ্গ আলোচিত হতে দেখি না আমরা। জাতীয় সংসদের বাইরেও সংসদ সদস্যগণ মন্ত্রণালয়ভিত্তিক যোগাযোগ ও আধাসরকারি পত্র বিনিময়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। 
ছাতকের কৈতকে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলার একমাত্র ট্রমা সেন্টারটি দ্রুত চালুর লক্ষ্যে জনপ্রতিনিধিগণসহ স্বাস্থ্য বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে আমরা আশা করি। কেবল শোভাবর্ধন, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের পকেট ভারি করা ও কমিশন বাণিজ্যের জন্য সরকারি অর্থের ব্যবহার বন্ধ হোক; এমন এক পরিবেশ দেখার ইচ্ছা সকলের। সরকার ও প্রশাসন কি তা পূরণ করতে পারবেন ?

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার