প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৮
সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চালু নিয়ে যে রহস্যাবর্ত তৈরি হয়েছে তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে। বস্তুত আমাদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপনিবেশ—কালের সেই ঐতিহাসিক জটিলতা এখনও কাটিয়ে উঠা যায়নি। গণস্বার্থে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি চালু করতে না পারা স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও বহাল তবিয়তে জায়মান থাকবে এটি চিন্তার অতীত হওয়ার কথা ছিলো। তা তো হয়—ই নি, বরং কুণ্ডলি পাকানো সাপের মতো আমাদের পুরো শরীরকে পেঁচিয়ে রেখেছে। এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশের জনপ্রিয় সাহিত্যিক কিষণ চন্দরের ‘জামগাছ’ গল্পটির কথা মনে পড়ে। ওই গল্পে একটি জামগাছ কাটার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মানবতার কবর রচনার করুণ আখ্যান উঠে এসেছিলো। সেক্রেটারিয়েটে ঝড়ে একটি জামগাছ পড়ে গিয়েছিলো। দুর্ভাগ্যবশত জনৈক কবি ওই গাছের নীচে চাপা পড়েন। মালি গাছ পড়া ও চাপা পড়া লোককে দেখতে পেয়ে চাপরাসিকে খবর দেয়, চাপরাসি ডেকে আনে ক্লার্ককে, ক্লার্ক দ্বারস্ত হন সুপারিনটেনডেন্টের। চাপা পড়া লোকটিকে বাঁচানোর জন্য গাছটি সরানো দরকার ছিলো। কিন্তু ফাইলে তো অনুমোদন লাগবে, নচেৎ কাজটি অবৈধ হবে।
দেখা গেলো সেক্রেটারিয়েট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত একটি বিভাগ। ফাইল যায় বাণিজ্যে। বাণিজ্য মত দেয় এটি কৃষি ডিপার্টম্যান্টের এক্তিয়ার, অতএব ফাইল চললো সেখানে। কিৃষ পাঠালো উদ্যানতত্ত্ব বিভাগে। সেখান থেকে মতামত আসলো— এখন বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ চলছে, তাই গাছ কাটা আইনত অপরাধ। শেষমেষ গাছ সরানোর অনুমোদন এসেছিলো কিন্তু ততক্ষণে গাছের নীচে চাপা পড়া কবি ভদ্রলোকের প্রাণ উড়ে গেছে মহাশূন্যে। আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতা একজন কবির বেঁচে থাকার সমূহ সম্ভাবনাকে সমাধিস্ত করতে সক্ষম হলো। এই গল্পের ভিতর যে মর্মন্তুত বার্তা সেটি হলো মানবিকতার উর্দ্ধে আর কোনো নিয়ম বা পদ্ধতি বড় হতে পারে না। কিন্তু সেই বার্তা যে আমরা এখনও মগজে ধারণ করতে পারিনি, প্রতিদিনের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়। সর্বশেষ সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতাল চালুর বিষয়েও আমরা একই ধরনের জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়া দেখলাম।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গত ৭ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিলো, পরবর্তী ছয় সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতালের আউটডোর সেবা চালু হবে, ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু করার প্রতিশ্রম্নতি ছিলো তখন। ছয় সপ্তাহ ইতোমধ্যে ১১ সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। আউটডোর স্থাপনের ন্যূনতম অগ্রগতি নেই। হবে কী করে, এখন পর্যন্ত যে হাসপাতাল কতৃর্পক্ষ গণপূর্ত থেকে ভবনই বুঝে নেননি, অথচ গণপূর্ত বলছে— তাঁরা এক বছর আগেই ভবন বুঝে নেয়ার চিঠি দিয়েছিলেন। এক বছরে কেন ভবন বুঝে নেয়া হলো না এ সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাফ জবাব— ভবন বুঝে নিলে কী হবে, জনবল তো নেই। হাসপাতালের জন্য ২১৫ জনের জনবল অনুমোদন হয়। কিন্তু এর বিপরীতে পদায়ন হয়নি। হাসপাতালের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য আর্থিক কোড তৈরি হয়নি, ফলে হাসপাতালের পিছনে এক টাকা খরচের ক্ষমতাও নাকি নেই কর্তৃপক্ষের। এখন করতে হবে সমন্বয়সভা। হবে সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ ফের পহেলাকে শুরু করতে হবে। তাহলে শিক্ষার্থীরা তাঁদের মানসম্মত ক্লিনিক্যাল ক্লাস করার জন্য যে আন্দোলন করেছিলেন এবং স্থানীয় জনসাধারণ হাতের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য যে আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়েছিলেন; সেগুলোকে কি আমলাতান্ত্রিক প্যঁাচ দিয়ে কিষণ চন্দরের ওই কবির মতোই অকাল সমাহিত করা হলো ? আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষকে কি বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করতে পারি, যে কথা রাখা যাবে না সে কথা বলা হলো কেন ? এ—কি কেবলই একটি শক্তিশালী কর্মসূচিকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করে নষ্ট করার অপকৌশল ?
এই মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিবেন বেশ কিছু শিক্ষার্থী। তাঁরাসহ তাঁদের অনুজ শিক্ষার্থীরা চিকিৎসাবিদ্যার অপরিহার্য ক্লিনিকাল ও ব্যবহারিক পর্বের পর্যাপ্ত শিক্ষা না নিয়েই চিকিৎসক হতে চলেছেন। শিক্ষার্থীরা বারবার এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু কখনও সেটি বিবেচিত হলো না। বরং শিক্ষার্থীদের সাথে নোংরা কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করা হলো। এই ধরনের অনভিপ্রেত অপকৌশলের নিন্দা জানানোর ভাষাও আমাদের জানা নেই। যে প্রশাসনিক পদ্ধতিগত প্রক্রিয়াগুলোকে এখন সামনে আনা হচ্ছে, আন্তরিকতা থাকলে তা দূর করা খুব কষ্টকর ছিলো না। এই অবাঞ্ছিত অপকৌশল শেষ হয়ে এখানে হাসপাতাল চালু হবে কবে ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন