প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫০
দোয়ারাবাজার উপজেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত পাহাড়ি নদী মরা চেলা থেকে অবৈধ প্রক্রিয়ায় পাড় কেটে ও ড্রেজার মেশিন লাগিয়ে বালু কাটা এবং নদী তীরবর্তী জনপদ ঝঁুকিগ্রস্ত হওয়াসহ সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনা সেই একই রকমের। যেমন হয়েছে—হচ্ছে জাদুকাটায়, চলতি নদীতে; ঠিকই একই ঘটনা। দুরন্ত লুণ্ঠনবাজির শিকার এই ছোট্ট নদীটি। স্থানীয়রা বারবার নদীর পাড় কাটার কারণে জনবসতি হুমকির মুখে পড়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গত শনিবার বালু নিতে আসা একটি নৌকায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। নদী তীরবর্তী সোনাপুর গ্রামের কয়েকটি বাড়ি ভাঙন ঝঁুকিতে পড়লে গত রবিবার গ্রামের লোকজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে প্রতিকার পেতে যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে না পেয়ে তাঁরা দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতাকে জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায় এই নদীতে চলছে বালু তোলার মহোৎসব। দিনের পর দিন যখন একই ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড চলতে থাকে তখন সেটিকে বিচ্ছিন্ন প্রবণতা ভাববার অবকাশ নেই। রীতিমতো ঢাক—ঢোল বাজিয়ে এই নদী থেকে বালু লুট হচ্ছে। যাঁদের দেখার কথা তাঁরা চোখ বন্ধ করে রেখেছেন। প্রতিবিধানকারী কর্তৃপক্ষ যখন বেআইনি কর্মকাণ্ড ঠেকাতে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে অনিচ্ছুক থাকেন তখন যে নিরীহ গ্রামবাসীর প্রতিবাদ বাতাসে মিলিয়ে যেতে বাধ্য; তা বুঝতে খুব বেশি বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বেআইনি কর্মকাণ্ড ঠেকানোর একমাত্র পথ হলো আইনের নির্মোহ ও কঠিন প্রয়োগ। মরা চেলা নদীটি আজ যে আগ্রাসনের শিকার, এর তীরবর্তী জনপদ যে ঝঁুকিগ্রস্ত; তার পিছনে আইনি প্রতিকার না হওয়ার বিষয়টি প্রত্যক্ষ। আর প্রভাবশালী বলতে যে পরান্নভোগী সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্ম হয়েছে তারা সকলেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত একটি সংখ্যাল্প গোষ্ঠী। এই সংখ্যাল্প গোষ্ঠীটি দেশের যাবতীয় সম্পদ ও সম্ভাবনা উদরস্ত করে নিজেদের মোটা পেট আরও স্ফীত করে তুলেছে। প্রচলিত রাজনৈতিক—প্রশাসনিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ভিন্ন এই জায়গায় খুব বেশি ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করাও অতিশয় দুরূহ। জেলার সকল বালুমহালের ক্ষেত্রেই এই কথা সমান প্রযোজ্য। আজ সম্পদশালী চলতি ও জাদুকাটা নদী আগ্রাসী লোভের কারণে প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে উঠেছে। মরা চেলা নদীটিও সেই দশাপ্রাপ্ত হওয়ার পথে। যতটুকু জানা যায়, মরা চেলা নদীর কোনো অংশ ইজারাধীন নয়। ইজারাধীন থাকলেও যান্ত্রিক জলযান বা যান্ত্রিক খননযন্ত্র ব্যবহার করে বালু আহরণ এবং নদীর পাড় কেটে প্রকৃতি—প্রতিবেশের ক্ষতিসাধন করা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। আর ইজারাবিহীন এলাকায় তো এই ধরনের কর্মকাণ্ড চলতেই পারে না। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আমাদের প্রশ্ন, মরা চেলা নদীকে বিপন্ন করে এই বালু আহরণের আগ্রাসন নির্বিবাদে চলছে কী করে ?
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া পাহাড় থেকে উৎপত্তি মূল চেলা বা চিলাই নদী। দোয়ারাবাজার জেলার সীমান্ত দিয়ে এটি বাংলাদেশে ঢুকেছে। পথপরিক্রমা শেষ করে নদীটি সুরমাতে মিশেছে। বাংলাদেশ অংশে নদীর দৈর্ঘ খুব বেশি নয়। পাহাড় থেকে জলধারা প্রবাহিত হওয়ার সময় নদীটি সাথে করে নিয়ে আসে বালু, কয়লা, নুড়িপাথর ও পাথর। প্রকৃতির নিয়মে উজানের এই সম্পদ ভাটিতে নেমে আসে। একসময় বারকি শ্রমিকরা কোদাল, বালতি, বেলচা দিয়ে এই বালু—পাথর আহরণ করে সংসার চালাতেন। বংশপরম্পরায় এই জীবিকা ছিলো তাঁদের। গত দুই দশকে প্রাকৃতিক এই শ্রমজীবী—বান্ধব সম্পদের উপর লোলুপ নজর পড়েছে ‘সর্বখাই’ নামক লুটেরা গোষ্ঠীর। এইসব প্রাকৃতিক বালু ও পাথরমহালে প্রচলন ঘটেছে সামন্ততান্ত্রিক ইজারাদারি ব্যবস্থা। শ্রমজীবী বারকি শ্রমিকদের বিশাল অংশ এই জায়গা থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। কর্মচ্যুত শ্রমিকদের জায়গা দখল করেছে পরজীবী রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট তথাকথিত ‘প্রভাবশালী’। এই প্রভাবশালীরা সাথে করে নিয়ে এসেছে ড্রেজার, বোমা মেশিন, বড় ইঞ্জিন নৌকা এবং লোভের বিশাল বপু। এরা নদীর তলেরটা কুড়িয়ে শান্তি পায় না। আরও অধিক মুনাফার জন্য নদীর পাড় কাটা শুরু করেছে। এতে নদীর স্বাভাবিক ধারা ও গতিপথ নষ্ট হয়ে পাশ^র্বর্তী জনপদ ও মানুষের জন্য অশেষ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতির শিকার সাধারণ মানুষ মাঝেমধ্যে প্রতিকার চায়, কখনও ক্ষোভে বিস্ফোরিত হয়ে নৌকা জ¦ালায়। কিন্তু আগ্রাসন থামে না থামবে না। এটি থামতে পারে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই।
জেলার নান্দনিক নৈসর্গিক শোভামণ্ডিত পাহাড়ি নদী জাদুকাটা আজ সংহারী ও প্রমত্তা রূপ ধারণ করেছে। চলতি নদীও তাই। এখন কি মরা চেলাও আরেকটি জাদুকাটা হওয়ার অপেক্ষায় আছে ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন